বিশ্বকাপ ফুটবল ১৯৯০

এক

চার বছর পরপর একবার বিশ্বকাপ ফুটবল হয়, আমাদের এমনি পোড়া কপাল এইচএসসি পরীক্ষা আর খেলা, একই সময় পড়ল। সারারাত খেলা দেখে সকালে পরীক্ষা দেয়া কঠিন হবে, সুতরাং আইন জারি হল “খেলা দেখা যাবে না”। আমাদের ব্যাচ এসএসসি পরীক্ষায় ভাল ফল করেনি, তাছাড়া দুষ্টের শিরমনি সুতরাং আমাদের কারণে সবার খেলা দেখা বন্ধ।

আমাদের ব্যাচের লোকজন প্রথমে খুব একটা পাত্তা দিলনা, এরকম গুরুত্বপূর্ণ একটা সময়ে খেলা না দেখাইতো ভাল! কেউ কেউ একটু খুন-খুন করে নিয়ে শেষ অব্দি মেনে নিল।

এর মধ্যে খবর এলো , আমাদের পরীক্ষার সেন্টার বাহিরে হবার সম্ভাবনা আছে। বাহিরের কলেজের শিক্ষকদের ধারণা ক্যাডেটরা তাদের নিজেদের কলেজে পরীক্ষা দেয়, ভেতরে বসে কি কি করে কে জানে! এসব কারণে এরা ভাল রেজাল্ট করে। তারা অনেকদিন থেকেই এই পরিবর্তন চাইছিল। আমরা সম্ভাব্য এই পরিবর্তনে মহাখুশি। আনন্দে পড়াশুনা ছেড়ে দিলাম। দুইদিন পর খবর এল নিরাপত্তার কারণে এটা করা যাচ্ছেনা। আমরা হতাশ হয়ে আবার পড়াশুনা শুরু করলাম। পরীক্ষার আর মাত্র দুইদিন বাকি।

বাহিরের কলেজের শিক্ষকগন ভাবতেও পারবেন না বাহিরে পরীক্ষা হলে ক্যাডেটরা কি পরিমান খুশি হবে। আমাদের পরীক্ষা হয় একটি অডিটোরিয়ামে। ৪০০ লোকের বসার মত পরিসরে মাত্র ৫০ জন পরীক্ষা দেয়। গ্রিল দিয়ে ঘেরা থাকে পুরো এরিয়া, বাথরুম তার ভেতরে। পরীক্ষা শুরুর আগে দেয়াল রং করা হয়, ডেস্ক ও চেয়ারে বার্নিশ দেয়া হয়। এক বেঞ্চে বসে দুজন পরীক্ষা দেব ভাবতেই বিস্ময় বোধ করলাম। আমাদের সর্বোচ্চ যা দরকার হত তা হল লিখতে লিখতে দুই একটা পয়েন্ট ভুলে যাওয়া, এর বেশি কিছু নয়। কিংবা অংকের রেজাল্ট মেলানো।

পরিক্ষার দিন প্রায়-নগ্ন করে চেক করে ঢোকানো হয় সেই অডিটোরিয়ামে। সামনে থাকেন তিনজন ইনভিজিলেটর, পেছনে দুজন। এর মধ্যে সরকারি আমলা আর নানা রকম টিমের আনাগোনাতো আছেই। মরার উপর খাঁড়ার ঘা প্রতিদ্বন্দ্বী কলেজ থেকে আসা একজন ইনভিজিলেটর, তাঁর যন্ত্রণায় টেঁকা দায়।

অপরাধী থাকলে পুলিশের অসীম ক্ষমতা, না থাকলে বেচারা ক্ষমতা দেখাবেন কিভাবে? সুতরাং হম্বিতম্বি সার। অনেকে এই পর্যন্ত শুনেই দুম করে বলে বসতে পারেন তাহলে আপনাদের নকল করার ইচ্ছে আছে, সুযোগ নেই! উত্তর “না”। এই রোমাঞ্চ শুধু বাহিরে যাবার জন্যে। যারা বন্দি থেকেছেন তারাই জানেন মুক্তির আনন্দ কিরকম দেখতে।

পড়াশুনার এইসব ক্ষতি নিয়ে আমরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনোনিবেশ করলাম।


দুই

খেলা শুরুর দিন খেলার সময় যতই কাছে আসতে লাগলো ততই আমাদের অস্থিরতা বাড়তে লাগল। বাহার আমাদের কলেজের ঘোষিত ম্যারাডোনা। সে হাউসে হাউসে পাক খেতে লাগল। একটু ব্যাখ্যা করা দরকার, বাহারের দুলাভাই ছিলেন ইকনমিক্সের শিক্ষক। কমেন্ট্রি করতে গিয়ে একদিন এই ঘোষনা দেন, যেহেতু বাহার অসাধারণ একজন খেলোয়াড় ওটা স্থায়ী হয়ে গেল।

আমাদের আরেকজন সেরা খেলোয়াড় ছিল বদরুল। আমাদেরই প্রিয় বন্ধু, বাহার শের-ই-বাংলা হাউসের আর ও সোহরাওয়ার্দী হাউসের। অতি ভাল ছেলে। শাদামাটা মাটির মানুষ ছিল বিধায় কখনই সামনে আসত না। গোল পোষ্টের কাছে পরাস্ত গোল কিপারের অসহায় মুখের সামনে বল পাস করে দিত আরেকজনে কাছে।

কলেজ জীবনের শেষ দুই খেলায় তাকে আমি লোভ দেখালাম যদি হ্যাট্রিক করতে পারে একটা চাবির রিং উপহার দেব। চাবির রিং খুবই পছন্দ করে সে। নিশ্চিত রিঙের জন্য নয়, পর পর দুই খেলায় দুইটি হ্যাট্রিক করেছিল সে। চাবির রিংটা আজো দেয়া হয়নি। এরপর আমরা কলেজ থেকে চলে আসি, সেরকম করে আর দেখা হয়নি। এখন সে বিদেশে থাকে, যোগাযোগ সামান্য, শুধু মেইলে।

পয়েন্টে আসি, ইতিমধ্যে একজন বলেছেন গল্প করতে গিয়ে আমি অন্য বিষয়ে প্রচুর কথা লিখি। বাহার মুখ চুন করে একতলা, দোতলা, তিনতলা করতে লাগল। ফয়েজ অতি ভাল ছাত্র, এসএসসি তে ষ্ট্যান্ড করেনি, এবার না করলে আমাদের মান থাকেনা। খেলা প্রিয় মানুষ সে, খেলা না দেখে থাকা সম্ভব কিনা এটা নিয়ে মনে হয় নিজেই গবেষণা করতে লাগল। বাকিদের অবস্থাও কমবেশি একই।

অন্য ক্লাসের ছাত্ররা মনে মনে গালি, আর মুখে অনুযোগ দিতে লাগল, যেন আমরা সেধে পরীক্ষার এই তারিখ ফেলেছি। কিন্তু খেলা দেখতে চাইলেইতো আর খেলা দেখা যায় না, তার জন্য টিভি নামক চারকোনা বস্তু লাগে! আমাদের তিনটি কমনরুম তালা মেরে রাখা হয়েছে।


তিন

প্রথম খেলার দিন কে কিভাবে কমনরুম খুলেছে মনে নেই, আমরা খেলা দেখতে পেরেছিলাম। পরেরদিন শিক্ষকরা আমাদের সাথে খেলা নিয়ে আলাপ করতে এসে দেখলেন আমরা সবই জানি। বুঝলেন আমরা খেলা দেখেছি। একটা মিটিং করলেন, সিদ্ধান্ত হল কমনরুম বন্ধ থাকবে, হাউস টিচারগন খেয়াল রাখবেন।

পরেরদিন কমনরুম বন্ধ থাকবে জেনে অনেকগুলো দরজার মধ্যে যেগুলো কখানোই খোলা হয় না তার একটি আমরা খুলে রাখলাম। হাউসের শিক্ষক আর সহকারীগণ সামনের দিকের সব দরজা ভালো করে লাগালেন, কিন্তু ঐ দরজাগুলোর কাছে গেলেন না। রাতে যথারীতি খেলা দেখা হল। সকালে আমাদের কথাবার্তা শুনে শিক্ষকদের মুখ লম্বা হয়ে গেল। অন্য ক্যাডেট-দের চোখে ইর্ষার কটাক্ষ।

দুই/চার দিন এভাবে চলার পর আমাদের আক্কাসআলী স্যার মাঠে নামলেন। আক্কাস স্যার আমাদের ক্লাসের ক্যাডেট রানার বাবা, অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দী হাউসের হাউস মাষ্টার । হাউস মাষ্টার-রা খুবই ক্ষমতাবান ব্যক্তি। আক্কাসআলী স্যার প্রবীন হওয়ায় তার ক্ষমতা আরো বেশি। উনি বাংলা ডিপার্টমেন্টের হেড, কলেজ পরিচালনা কমিটির সদস্য ইত্যাদি।

রানার বাবা হওয়ায় আমাদের অসুবিধা ছিল অনেক, উনাকে অনেক বেশি মেনে চলতে হত, আমাদের দিকে তাঁর দৃষ্টি ছিল কড়া, ভাল করতে হবে। শাসনের ব্যাপারে উনি ষোল আনা কড়া হলেও আমাদের কখনো কোন সুবিধা দেননি। উনার হয়তো মনে হত, আমাদের ব্যাচের জন্য কিছু করলে অন্যরা ভাববে উনার ছেলের জন্যই উনি এটা করছেন, সে কারণেই তাঁর সারা জীবনের সততার দেয়ালে উনি দাগ লাগতে দেননি। এদিকে বেচারা আমরা চ্যাপ্টা হয়ে গিয়েছি।

আক্কাস স্যার তাঁর স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে হম্বিতম্বি করে হাউস এ্যাসিসটেনন্ট-দের ডেকে নিয়ে বললেন ঠিকভাবে বন্ধ করলে কিভাবে ওরা খেলা দেখে? এ্যাসিসটেনন্ট-রা মাথা চুলকে হতাশ কন্ঠে বলে

-বিশ্বাস করেন স্যার বিষয়ডা আমাগো মাতায় ঢুকতাছে না।
-মাথায় ঢুকবে কি করে তোমাদের মাথায় গোবর
-স্যার ছাত্ররা মনে হয় যাদু জানে
-যাদু! দেখাচ্ছি সব ম্যাজিশিয়ানদের ……………………।।

সে তালা নিজে টেনে দেখলো। সামনের দরজা গুলোর লক দেখলো। পরেরদিন স্যারের মাথা খারাপ হবার যোগাড়। ক্যাডেট-রা খেলা দেখেছে! কিকরে সম্ভব?

আমরা সোহরাওয়ার্দী হাউসকে বেছে নেবার পেছনে একটা কারণ ছিল, গভীর রাতে খেলা হয়, শিক্ষক বা স্টাফরা হাউস পরিদর্শনে আসলে সংখ্যায় একদুজনের বেশি হবেন না, স্যারদের তিনতলা পর্যন্ত আসতে বেশ সময় লাগবে, পালানোর জন্য অনেকটা সময় হাতে পাওয়া যাবে।

সেদিন রাতে স্যার এসে সব দরজা চেক করলেন, আমাদের গোমড় ফাঁক হল। খুলে রাখা দরজা আবিস্কার করে আনন্দে এক চিৎকার দিয়ে সে জানান দিল, “যাদু, যাদু-টোনা, ম্যাজিক এই দেখ ম্যাজিক, সেই সাথে হাউস এ্যাসিস্টেন্টদের বকা ঝকা কেন তারা তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে না?

আমাদের মাথায় বজ্রপাত হবার যোগাড়, এখন কি হবে? গভির রাতে নানান ফন্দি করছি, এই সময় কে যেন একটা বাঁশের মাথায় একটা বাঁকা করা জিনিষ বানিয়ে নিয়ে এল। সেপ্টিপিনের মত একটা তামার তারকে বাঁকা করে মাথায় সুতা লাগিয়ে একটা হুকের মত করে জানালা খোলা হল, তারপর ঐ বাঁশের যন্তর ঢুকিয়ে সিটকিনি খোলা হল। আনন্দের সাথে খেলা দেখা চলতে লাগল।

আক্কাস স্যার সদর্পে ঘোষণা করেছেন তিনি ক্যাডেটদের তেলসমতি ধরে ফেলেছেন! আমরা আমাদের পরাজয় মেনে নিলে পরের খেলাগুলো নির্বিঘ্নে দেখতে পারি। কিন্তু পরাজয় মেনে নেই কি করে? শত হলেও আমরা বিসিসি ৭ম ব্যাচ! আমাদের কেউ কেউ বলা শুরু করল স্যার আপনি ওই গোলটা দেখেছেন? স্যার অমুক প্লেয়ারের ওই পাসটা ঠিক হলে এই গোলটা হত, তাই না স্যার? নিখুঁত এই বর্ণনা শুনে স্যারের ভ্রূ কোঁচকাল। তোমরা জানেল কি করে?


 

চার

ক্যাডেট কলেজের ছেলেরা সারা বছর একটা নিয়মে পড়াশুনা করে বলে, পরীক্ষার সময়টাতে খুব বেশী টেনশন করতে হয়না। আর পুরো সিলেবাস পড়া থাকে বিধায় প্রশ্ন কমন পড়বে কিনা এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। সুতরাং পরীক্ষা আমরা ভালোই দিচ্ছিলাম। ক্যাডেট কলেজে প্রচুর পরীক্ষা হয় বিধায় পরীক্ষা ভীতি বলে কোন ব্যপার থাকেনা।

একদিন একটা কান্ড হলো। আমাদের অডিটরিয়ামের পাশেই সুন্দর ফুলের বাগান। সেই বাগান থেকে পরীক্ষার হলে একটা বড় গুইসাপ ঢুকে গেল। বাংলা পরীক্ষা। আজকের দিনের মত অবজেক্টিভ ছিলনা তখন। বাংলা লিখতে লিখতে হাতে ফোস্কা পড়ে যেত। এদিকে ক্যাডেট-রা চিৎকার দিয়ে চেয়ারের উপর পা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। শিক্ষকদের মাথা খারাপ হবার যোগাড়।

খবর পেয়ে এডজুটেন্ট তার বাহিনী নিয়ে এলেন, হাউস মাষ্টারগন দৌড়ে এলেন। কিছুক্ষন পর আক্কাস স্যার টের পেলেন।

“এইচএসসি পরীক্ষার হলে শয়তানি! আজ বাংলা পরীক্ষার দিন সময় নষ্ট!” এক চিৎকার। আক্কাস স্যার প্রথম ব্যক্তি যিনি বুঝতে পেরেছেন আমরা ভয় পাইনি, দুষ্টামি করছি। অন্যসব শিক্ষকদের হুশ হয়েছে ততক্ষণে। তারা আহা, আহা আজকের দিন এইরকম শয়তানি করে? লিখ, লিখ, লিখা শুরু কর! বলে আফসোস করতে লাগলেন।

ইনভিজিলেটর সাহেব মুচকি হাসতে লাগলেন, বাছাধন কিভাবে লেখা শেষ করো দেখি। পরীক্ষা ভালো হল। সারা কলেজে আমাদের এই চরম বোকামীর খবর চাউর হল। দুপুরে, লাঞ্চ করতে ডাইনিং-এ গেছি। আক্কাস স্যার সেখানে উপস্থিত হয়ে বললেন, দেখেছ তোমরা এদের কান্ড! আমরা যখন বাংলা পরীক্ষা দিয়েছি, পরীক্ষার পর হাত থেকে কলম আর খুলতে পারিনা। দুজন টেনে সেই কলম খুলেছে, আর এরা!

উনি কিছুতেই বাংলার প্রতি আমাদের এই আমুদে হাল্কা মনোভাব সহ্য করতে পারছিলেন না। কেউ কেউ আবার বলা শুরু করলো তার পরীক্ষার সময় ডাইরিয়া হয়েছে, কারো জ্বর। এইসব কান্ডের মধ্যে আবার ফুটবল। শিক্ষকদের ঘুম হারাম। আক্কাস স্যারের বেশি, কারণ রানাও পরীক্ষা দিচ্ছে। যেভাবে হোক খেলা দেখা বন্ধ করতে হবে।


 

পাঁচ

শিক্ষকগণ মহা বিরক্ত হয়ে, টিভি নিয়ে হাউস মাষ্টারের রুমে তালা বন্ধ করলেন। এই রুমে একটাই দরজা। খুবই গুরুত্বপূর্ণ সব কাগজপত্র, হাউস ফান্ডের লকার এসব থাকে, সুতরাং সেভাবেই রাখা হয়। হাউস মাস্টার নিজে দাঁড়িয়ে থেকে জানালা দরজা লাগালেন। চাবি পকেটে পুরে বাড়ি চলে গেলেন। আমাদের মাথায় হাত।

রাত নয়টা পর্যন্ত ভালোই পড়াশুনা হল। সেদিন গুরুত্বপূর্ণ খেলা। ফয়েজ, শওকত, হায়দার-আমরা মিলে খেলা দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিভাবে তখনও জানিনা। ভয়ংকর সব আইডিয়া মাথায় এলো। ভোর রাতে খেলা। আমরা নয়টার দিকে মাঠে নামলাম। উপর তলার দুই হাউসে হাউস মাষ্টারের রুমে ব্যাংকের মত একটি লোহার পাত বসিয়ে তিনটি করে তালা মারা। সেগুলো খোলার চেষ্টা করলে ডাকাতির মামলায় পড়তে হবে। সুতরাং শরীয়তউল্লাহ হাউস-ই ভরসা। এটি আমাদের হাউস।

হায়দার আবিষ্কার করল এই তালা লাগানোর পর দুই কড়ার মাঝখান দিয়ে কিছুটা ফাঁক হয় যার মধ্যে কিছু একটা ঢোকান সম্ভব। আমাদের এইসব উদ্যেগ দেখে অন্য ব্যচের ছেলেরা নানান মন্তব্য করতে লাগল।

“আজকে আর আপনাদের জারিজুরি খাটবেনা, বাদ দেন” আজকে যদি খেলা দেখতে পারেন, সারা জীবন আপনাদের গুরু মেনে নেব…………………এই সব। তালাটা বেশ বড়, কড়াগুলো মোটা, আমরা সিনেমার মত তার ঢুকিয়ে তালা খোলার চেষ্টা করলাম, ঘর্মাক্ত, বিরক্ত এবং ত্যাক্ত হয়ে হতাশ হয়ে বসে থাকলাম কিছুক্ষণ। এই সময় শওকত বুদ্ধি বের করল, যদি কড়ার পেছনের নাট খোলা যায় তাহলে খেলা দেখা সম্ভব। নাট খোলার জন্য যন্ত্রপাতি দরকার। বাহারকে খবর দেয়া হল, ও এসে পানির পাম্প থেকে সব নিয়ে এল। দুলাভাইর দৌলতে ওকে সবাই চেনে। খুব বেগ পেতে হয়নি।

এখন সমস্যা হল ঐটুকু ফাঁক গলে হাত ঢুকবে কি করে? হায়দার ইট, কাঠের টুকরা এইসব এনে দরজার ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে ফাঁকা একটু বড় করল। তার মধ্যে দিয়ে কিভাবে যেন ফয়েজ, শওকত আর রইস হাত দিয়ে নাট খোলার চেষ্টা করতে লাগল। দীর্ঘ দুই ঘন্টা চেষ্টা করে নাট খোলা হল। ওদের হাতের অবস্থা যা হল তাতে পরীক্ষার কথা ভেবে চিন্তা হবার কথা।

টিভি বের করে নিয়ে গেলাম সোহরাওয়ার্দী হাউসে। দুটো কারণ এক, পালানোর সময় এবং দুই এন্টেনার তার। প্রস্তুতি শেষ হল। ভোর রাতে খেলা দেখে, রাতেই আবার টিভি হাউস রুমে রেখে লক করা হল। কিন্তু ভাল টাইট দেয়ে গেলনা।

মরার মত ঘন্টা দুই ঘুমিয়ে গেলাম পরীক্ষা দিতে। পরীক্ষার পর শুরু স্যারদের সাথে খেলা নিয়ে আলোচনা। সেদিন জুনিয়র টিচার ছিলেন ডিউটি মাস্টার তিনি বিস্ময়ে হতবাক, তো…ম…রা… আই মিন…তো…ম…রা কি করে জানলে এসব? ধরা পড়েছিলাম আরো কয়েকদিন পর। সেটা ঐ নাটের কারণে। কিন্তু সেটা যে আমরা করেছি তার কোন প্রমান ছিলনা।

মিস করি সেইসব দিন……………………………………………………………।

Advertisements

মাছ ধরা


  পর্ব -০১

এসএসসি-তে উঠার পর একটি ক্যাডেটের একটি শিং গজায়, আর এসএসসি পরীক্ষার সময় দুটো শিং এবং একটি লেজ। আমাদেরও গজালো, আমরা নিয়ম, কানুন, সভ্যতা সব ভুলে নৈরাজ্য-বাসী। শিক্ষকরা যারা নরম মনের মানুষ তাঁরা বলতেন, আহা! ছেলেগুলো বাবা-মা ছেড়ে এত কষ্টে পড়াশুনা করে একটু নিয়মের ব্যত্যয় হলে ক্ষতি কি? শিথিল নিয়ম আর ইচ্ছা মাফিক চলার মধ্যে পার্থক্য আছে।

ক্লাস সাসপেন্ড হয়েছে, আমরা হাউসে পড়াশুনা করি। পরীক্ষা যখন খুব কাছে আমাদের ৫জন ক্যাডেট জুতা ছাড়া লাঞ্চ করতে গিয়েছে। পৃথিবীর সব দুষ্ট মানুষ মৃত্যুর পর ক্যাডেট হয়ে জন্মায় – যারা এই ধারণা পোষণ করেন তাদের মধ্যে একজন সেদিন ডিউটি মাষ্টার । যথারীতি তাদেরকে ডাইনিং হলে ঢুকতে দেয়া হল না। ক্লাসের ইজ্জতের ফালুদা হয়ে গেল। এর আগে অন্য ব্যাচকে দেয়া হয়েছে, আমাদের কেন দেবে না? একটা মজার বুমেরাং হল, কলেজে ঢোকার পর প্রথম তিন মাসে ক্যাডেটদের বংশ পরিচয় ভুলিয়ে দেয়া হয় এবং এক ধরণের টিম বিল্ডিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কমন ইন্টারেস্টের জন্ম দেয়া হত। সম্ভবত আর্মি থেকে এই প্রক্রিয়ার জন্ম। কিন্তু একতার বেশির ভাগ ব্যবহার হত, কলেজের নিয়ম ভাঙ্গার জন্য। বাকিটা প্রশাসন ও অন্য ব্যচের সঙ্গে ঝামেলা করার জন্য। সুতরাং বলা যায় প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া খুব-ই সফল ছিল।

প্রতিবাদ হিসাবে আমরা সবাই এক সাথে ডিনারে এলে সেটা নিয়ে তুমুল ঝামেলা হয়েছিল। এসএসসি পরীক্ষার্থীরা এই সুযোগ নেয় কারণ তারা বিশ্বাস করে এরকম গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষার আগে অন্তত শারীরিক নির্যাতন করা হবে না। আমাদের সেই ধারণা মারাত্মক ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। পরেরদিন দুপুরে ঠিক করা হল, নিজেরাই রান্না করে খাওয়া হবে। আমাদের কাছে কোন আগুন নেই, যেভাবে সিগারেট আনা হত সেই প্রক্রিয়ায় কিছু দেশলাই আসত। হাড়ি পাতিল বলতে একটা হরলিকস এর খালি বোতল আর খাবার জন্য একটি গ্লাস এবং পানির বোতল। অনেকে লুকিয়ে বিস্কুটের টিন রাখত। এসব কথা না ভেবেই প্রথমে মাথায় এলো মাছ ধরতে হবে।

হাউসের পেছনে একটি উঁচু দেয়াল, তার উপর কাঁটাতার। ওপাশে একটি লেক।এই লেকে মাছ চাষ হয়। বছরে একদিন বড়শি দিয়ে মাছ ধরা প্রতিযোগিতা হয়। এবং সেদিন হাত দিয়ে ডাইনিং হলে খাবার অনুমতি দেয়া হয়। হাত দিয়ে খাবার যত মজা, নিয়ম ভাঙ্গার মজা তার দ্বিগুণ। এইসব দিন খাবারে শর্ট পরবেই। এক স্যার ছিলেন ডাল শর্ট পরলে ‘এই টেবিলে ভাত দাও ‘ বলতে বলতে ডাইনিং হল ত্যাগ করতেন। এছাড়াও মাঝে মাঝে মাছ ধরা হত এবং সেদিন হাত দিয়ে খেতে দেয়া হত।


পর্ব -০২

বললেই অত বড় লেকে মাছ ধরা যায় না। মাছ ধরতে হলে জাল লাগে। আমাদের না আছে জাল না আছে এই বিষয়ে কোন অভিজ্ঞতা। একজন প্রস্তাব করল মশারি দিয়ে ধরা যেতে পারে। যেই বলা সেই কাজ। আমরা ১৫/২০ জন মশারি নিয়ে তৈরি। একটি টীম আমাদের বড় দেয়াল এপার-ওপার করতে সাহায্য করবে। আরেকটি টিম শিক্ষক বা গার্ড দেখলে সতর্ক করবে। কাঁটা তাঁরের উপর কম্বল বিছিয়ে আমাদের পার হওয়ার ব্যবস্থা করা হল।

আমরা ওপারে গেলাম, গিয়ে দেখি চারদিক নিঝুম, কোথাও কোন গার্ড নেই। অবাক হলাম, সাধারণত এরকমটা হয়না। সম্ভবত তীব্র রোদ এড়াতে সবাই পালিয়ে বেঁচেছে, তাছাড়া কেউ এখানে মাছ ধরতে পারে চিন্তা এতদূর অগ্রসর হবার কথা নয়। নেমে গেলাম পানিতে। মশারি দিয়ে মাছ ধরা যাবে কিনা সন্দেহ ছিল। সন্দেহ ভুল প্রমাণিত হল। অথবা এই লেকের মাছগুলো মহাবোকা। তারা বছরে এক-দুই দিন ছাড়া নিরুপদ্রব জীবন যাপন করে। খাবার দেয়ার আনন্দময় সময়টুকু ছাড়া অন্য কোন উৎপাতও সইতে হয় না।

মাছ ধরা চলছে এমন সময় লাল গিয়াস এক চিৎকার দিয়ে পুকুরের ভিতর দিকে সাঁতার দিল। গিয়াস মশারি আনার সময় পায়নি সুতরাং হাত দিয়ে মাছ ধরছিল। সে যখন তার মাছ তুলেছে দেখা গেল একটি মাছরাঙ্গা সাপ। ছেড়ে দিয়ে গিয়াস দীঘির মাঝের দিকে সাঁতার দিল সাপও একই দিকে, শুরু হয়ে গেল হুলস্থুল। গার্ডরা টের পেয়েছে, তাঁরা বাঁশি দিতে দিতে দৌড়ে আসছে। আমরা এই ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। গিয়াসকে ফিরিয়ে কোন মতে দেয়াল টপকালাম। বাঁশির শব্দে পুরো কলেজ ছুটে আসছে মনে হল, আমরা দৌড়ে রুমে ঢুকলাম। এই ব্যপারটি আগেই প্ল্যান করা ছিল। আমরা রুমে ঢুকেই বালতিতে মাছগুলো রেখে উপরে মশারি দিয়ে দিলাম, তার উপর সাবান আর ডিটারজেন্ট কেইস।

এডজুটেন্ট আর আর্মির ৪/৫ জন স্টাফ এসে হাজির হলেন। আমার রুম প্রথমে, আমার হাফপ্যান্ট এবং টাওয়েল জড়ানো খালি গা দেখে জানতে চাইলেন কি করছি, বললাম স্যার গোসল করতে যাচ্ছি। অনেকেই গোসল করতে যাচ্ছে হাতে বালতি, খালি গা, টাওয়েল জাড়ানো। এটা গোসলের সময়, আর এই গেটআপ নিতান্তই স্বাভাবিক। কলেজে লুঙ্গি বা অন্য কোন ব্যক্তিগত পোশাক রাখার নিয়ম নেই।

সবগুলো রুম ঘুরলেন কিছু পেলেন না। আমার ধারণা উনারা কল্পনাও করতে পারেননি আমরা মাছ ধরেছি। এবার একে একে রুম চেক শুরু হল। আমার খাটের নিচে মাছ ভর্তি বালতি অন্যদের মত সরাতে পারিনি। কারণ আমার রুম প্রথমে, আর মাছ ধরার স্পট থেকে শেষে। আমার রুমে একজন স্টাফ ঢুকলেন, মাছগুলো এখনো জীবিত, নড়ে চড়ে উঠছে আর প্লাস্টিকের বালতিতে শব্দ হচ্ছে। রুমে কিছু পেলেন না। যখন বেড়িয়ে যাবেন মাছগুলো জোড়ে নড়ে উঠল। উনি বাইরে গিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ালেন, নিচু হয়ে খাটের নীচ দেখলেন। কিছু নেই।

এডজুটেন্ট ও স্টাফরা দাঁড়িয়ে কিছু আলোচনা করল, তাদের চোখে মুখে একধরণের বিস্ময় এবং হতাশা। আমার রুমমেট রেজওয়ান অসম সাহসী মানুষ বালতি নিয়ে ওদের পাশ দিয়ে গোসল করতে চলে গেল। সব যখন শান্ত। মাছ গুনে দেখলাম ২৪টা ছোট বা মাঝারি সাইজের রুইমাছ। এখন রান্না হবে কি করে? অনেক প্ল্যান হয় কিন্তু কাজ হয়না।


পর্ব-০৩

আমাদের হাউস থেকে কিছু দূরে একটি পানির পাম্প আছে যেখান থেকে পুরো কলেজে পানি সাপ্লাই দেয়া হয়। বিরাট উঁচু পানির ট্যাংকের নিচে একতলা ঘর। বাহারের দুলাভাই কলেজের একজন শিক্ষক সেই সূত্রে সে জানে ওখানে গেলে রান্না-বান্নার ব্যবস্থা হতে পারে। একজন তিন চারটা শার্ট নিলো, ওখানে আমাদের কাপড় আয়রণ করা হয়, আমাদের ওদিকে যাওয়া নিষেধ। কাপড় নিয়ে ধরা পড়লে সমস্যা হবে তবে সেটা খুব বড় হবার কথা নয়। দুজন গেল। তারা মাছ দেখে প্রলুব্ধ হল। ঠিক হল ২০০ টাকা আর ৪ টা রুই মাছ দিতে হবে তাদের। ভাতের চাল, মশলা সব আমাদের জোগাড় করতে হবে। মহাবিপদ।

বিকালের শিফটে ডাইনিং এর কর্মচারীরা ডিউটি-তে যাচ্ছেন, ডাইনিং হল আর ওদের থাকার কলনি হাউসের দুই দিকে, সুতরাং বেআইনি ভাবে ওরা আমাদের হাউসের পেছনদিয়ে যাতায়াত করে। তানা হলে বড্ড দূর হয়। সাইকেল না থাকলে এতদূর হাঁটা কষ্টের ব্যাপার। আমাদের হাউস নিচতলায়। রুমের পিছন দিকে মস্ত জানালা। অপেক্ষার পালা শেষ করে তাঁরা এলেন, একজনকে চালের ব্যাপারটা গছানো গেল। বিনিময়ে ২টা রুই। এভাবে রাতে যখন খেতে বসেছি তখন আমাদের পাতে পড়ল ১১টা রুই, বাকি সব ঘুষ।

জানালায় কম্বল দেয়া হয়েছে। মাটিতে বিছানা। রাত দশটায় লাইটস অফ হয়ে যায়। তাই রাতে আলো জ্বালাতে হলে জানালায় কম্বল দেয়া হত। কাজটি করা হত খুব নিখুঁত ভাবে। তারপরও আমরা অতিরিক্ত সতর্কতা হিসাবে মোমবাতি জ্বালালাম। খেতে কেমন হয়েছিল নিজেরাই ভেবে দেখেন, এটাও আমাকে বলতে হবে? মাছ ধরতে ধরতে ক্লান্ত হয়ে গেছি।


 

একজন ভিক্ষুক  

প্রতিদিন অফিস যাবার সময় খানিকটা হেটে গাড়িতে উঠি। প্রতিদিনই একজন ভিক্ষুককে দেখি খোলা আকাশের নিচে জুবুথুবু বসে থাকতে। মাঝে মধ্যে চোখাচোখি হতো, কখনো ভিক্ষা চাইতো। আমি কোনদিন তাকে ভিক্ষা দেইনি। মনে হতো দান হতে হবে এমন যা সমাজকে স্থায়ী পরিবর্তন এনে দেবে। মানুষকে কখনই মানুষের কাছে হাত পাতার মত অসভ্য কাজটি করতে হবে না। সব দান সক্ষমতায় পরিনত হবে।

মাথায় অল্প বয়সে ঢুকে গেছে প্রথমে সমাজতান্ত্রিক শিক্ষা তারপর হিউম্যানিজামের মাছের গল্প। গল্পের শিক্ষাটা এই রকম ————

১. “আপনি যদি একজনকে একটা মাছ দেন” ………. সে একবেলা খেয়ে বাচবে, পরের বেলায় ক্ষুধার্ত। এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। দাতা পুণ্য কামাবেন আর গ্রহীতা চিরদিন গ্রহীতা হয়ে অসম্মানের জীবন কাটাবেন। দাতা মহৎ, দানশীল, পুণ্যবান। আর গ্রহীতা দীন এবং হীন।

২. “আপনি যদি একজনকে মাছ ধরতে সেখান”……….গুরু-শিষ্য ব্যক্তিগত ভাবে লাভবান হবেন। গুরু আত্মতৃপ্তিতে ভুগবেন, শিক্ষক হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাবেন–গৌরব বাড়বে। শিষ্য আজীবন কৃতজ্ঞ থেকে খেয়ে পরে বাচবেন । তারপর একদিন গুরু শিষ্য মারা যাবেন সঙ্গে তাদের জ্ঞান। সমাজ দরিদ্রই থেকে যাবে।

৩. “আপনি যদি একজনকে মাছ ধরতে সেখান এবং সে যদি আরেক জনকে শেখায়”………………..জ্ঞানটি ব্যক্তিগত থেকে সামাজিক সম্পদে পরিনত হবে, কেউ দাতা বা গ্রহীতা নয়, কেউ বড় বা ছোট নয়। গোটা সমাজ থেকে দারিদ্র দূরীভূত হবে, মানুষ পাবে অর্থনীতিক মুক্তি।

একদিন অফিস যাচ্ছি লোকটা আমাকে ডাকলো “এই শোন” ….তুই করে বলাটা আমাদের দেশের পীর ফকিরদের স্টাইল। তুই করে বললে বুঝতে হবে উনি কোনো ছদ্মবেশী পীর। আমার দীর্ঘ দিনের ওয়াশ করা ব্রেন এতো অল্পতে প্রভাবিত হবার নয় । আমি পাশ কাটিয়ে গাড়িতে গিয়ে উঠলাম।

সেদিন বিকেলে ফেরার পরে দেখি পুরনো ছেঁড়া কাঁথাগুলো পরে আছে, লোকটি নেই । একজনকে জিজ্ঞাসা করতে বললো লোকটি আজকে মারা গেছে। আমার আজো জানতে ইচ্ছা করে উনি আমাকে কি বলতে চেয়েছিলেন।

জানতে ইচ্ছা করে একজন মৃত্যু পথযাত্রীকে একবেলা খাবার দিলে সমাজের অগ্রগতি থেমে যায় কিনা । প্রচন্ড শীতে একজনকে একটা কম্বল কিনে দিলে তাদের স্থায়ী মুক্তি বিলম্বিত হয় কিনা !

গোল্লা স্যার।

 এক

ক্যাডেট কলেজ জীবনের প্রথম ক্লাস করতে এসেছি। একটা ঘোর ঘোর ভাব, অনেক প্রশ্ন, অনেক কৌতুহল, অনেক স্বপ্ন, অনেক অনেক ভয়। এখানকার শিক্ষকরা ক্যামন? তারা কি অন্যভাবে পড়ান? এখানকার সব শিক্ষক যে আকাশ থেকে নেমে আসা একেক জন প্রমিথিউস এব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ ছিলনা। তাদের ধী শক্তি তাদের বিচক্ষণতা, তাদের চরিত্র সব-ই রূপকথার সব সুপারনায়কের মত এটা বলার বা ভাবার কি আর অবকাশ আছে? নিজেকে আরিয়ান হয়ে ওঠা একজন ভাগ্যবান মানুষ বলে মনে হল। চিন্তা করতে করতেই ক্লাসের ঘন্টা পড়ল। অপেক্ষার উত্তেজনা শেষ করে একজন শিক্ষক ক্লাসে ঢুকলেন। আমাদের বসে বসে এ্যাটেনশন হতে হল।

শিক্ষকটির গায়ের রঙ ফর্শা। মাথাটা বিশাল, সেখানে বড় একটা টাক চক চক করছে। কপালে দিনের আলোর প্রতিফলন স্পষ্ট দেখা যায়। ঘাড় নেই। বিশাল মাথা সরাসরি কাধের উপর বসানো। বুক, পেট, নিতম্ব সব সমান। কোন ভাজ নেই। উচ্চতা পাঁচ ফুটের বেশি হলে অবাক হব। ফ্রেঞ্চ কাট দাঁড়ির মধ্যে ঢেউ খেলানো লাল টক টকে ঠোঁটে হাসি।

ক্যাডেটস আমার নাম নুরুজ্জামান মোল্লা। আমি তোমাদের অংক পড়াবো। তারপর ত্রিশ মিনিট ধরে একটা জ্যামিতি পড়ালেন। পড়ান শেষ করে জানতে চাইলেন কারো কিছু বলার আছে? কোন প্রশ্ন? আমি ক্লাসে কখনো কোন কথা বলিনা। উত্তর জানলেও বলিনা, মুখচোরা, কনফিডেন্সের অভাব, কিংবা অনাগ্রহ অথবা ভয়; এগুলোর যেকোন একটি অথবা সবগুলোই এর কারণ হতে পারে।

আমি হাত তুল্লাম, এবং একটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলাম। মোল্লা স্যার খুব সুন্দর করে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিলেন। আমি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ব্যবহারে মুগ্ধ। প্রশ্নোত্তর শেষ হবার পর বসে পড়াই নিয়ম। আমি স্যারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বসলাম। মোল্লা স্যার ডাস্টার হাতে নিয়ে সহজভাবে আমার কাছে আসলেন। ঘন্টা পড়ে গেছে। পরের শিক্ষক শাদা শার্ট, শাদা প্যান্ট, কালো জুতা আর বিশেষ কলেজ টাই পড়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।

কিছু বুঝে উঠবার আগেই মোল্লা স্যার ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আমার বিস্মিত চেহারা নিচু করে ধরা, গদাম গদাম করে ডাষ্টারের পিটুনি পড়তে লাগল। প্রথমে চুল ধরার চেষ্টা করলেন, সুবিধা করতে পারলেন না। প্রথমদিন এনেই বাটি ছাঁট দিয়েছে। চুল খুব ছোট করে কাটলে কান খুব প্রমিনেন্ট হয়ে যায়। জুত করে কান ধরলেন। দুই কান টমেটোর মত লাল করতে করতে জানতে চাইলেন, আমার বাবা কি করেন। আমি বললাম আর্মি অফিসার। উনি আরো কয়েকটা কিল ঘুষি মেরে বলতে লাগলেন ওও ইন্টারমিডিয়েট পাশ লোকের ছেলে! এই জন্যে আমাকে পরীক্ষা করে, আমি অংক জানিনা? অংক জানে তোর বাপ? সাপের মত হিস হিস আর ফোঁস ফোঁস করতে করতে বলতে লাগলেন কথাগুলো। আমাকে পরীক্ষা করা, আমাকে…… বুঝিয়ে দেব মজা…………।

যে শিক্ষক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আমি তার দিকে বিস্ময়ের সাথে তাকালাম। তিনি কি বুঝলেন জানিনা। বললেন মোল্লা সাহেব ছাড়েনতো বাচ্চা ছেলে। আজ প্রথমদিন! মোল্লা স্যার আমাকে ছাড়লেন কিন্তু তার ফোঁস ফোঁস বন্ধ হলনা। আর মুখে একই প্রলাপ ‘আমাকে পরীক্ষা করা, এত বড় সাহস’ বলতে বলতে বেড়িয়ে গেলেন। পুরো ক্লাস হতভম্ব। নিশ্চুপ। আমি তখনো বুঝতে পারছিনা কি হয়ে গেল। ক্যানো হয়ে গেল।

আমি নিজেকে পড়ে অনেক জিজ্ঞাসা করেছি, সেদিন প্রশ্নটা আমি কেন করেছিলাম? আমার মনে হয়েছে, এই যে ক্লাসে আমি ভয় পাই, কথা বলিনা, কিংবা অংশ নেইনা এই খারাপ গুণ আমি এখানে এসে বদলাতে চেয়েছিলাম। মোল্লা স্যার বুঝলেন কিছু অতিচালাক ছাত্রের মত আমিও নতুন শিক্ষকের পরীক্ষা নিচ্ছি, কেমন পড়ায় কিংবা কতটুকু জানে। সেদিনকার সেই আচরণে আমি কখনই আর বলতে পারলাম না ‘আবার শুধরে নেব জীবনের ভুলগুলি’ আমি আরো ঢুকে গেলাম নিজের ভেতরে। বদলে গেল কলেজের পরের সাতটি বছর।

 

 দুই

কেউ যদি মনে করে থাকেন মোল্লা থেকে গোল্লা শব্দের উৎপত্তি তাহলে মহাভুল করবেন। গোল্লা, মোল্লা স্যারের অতি প্রিয় শব্দ, কথায় কথায় এই শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন। তিনি অংকের শিক্ষক গোল্লা শব্দের প্রতি দূর্বলতা থাকা স্বাভাবিক। পদার্থবিদ্যা, দর্শন ও অংক শাস্ত্রে ‘শূন্য’ সংখ্যা নিয়ে বিচিত্র শব্দ হাইপোথিসিস আছে। পৃথিবীর সব বিজ্ঞানীদের মধ্যে এই সংখ্যা নিয়ে নানান অবসেশন কাজ করে। অনেকে বলেন ‘শূন্য’ থেকে কোন কিছুর জন্ম হতে পারেনা। অথচ সংখ্যা তত্বের জন্মই ‘শূন্য’ থেকে। এটাকে মেনে নিলে আমাদের বিজ্ঞানের অনেক থিওরি বাতিল হয়ে যায়। আবার মেনে না নিলে বিজ্ঞান বলেই কিছু থাকেনা!

এই ‘শূন্য’-সম্পর্কে তাও ফিলসফিতে কিছু মজার লাইন আছে। (based on nothingness)

• The thirty spokes unite in the one nave; but it is on the empty space (for the axle), that the use of wheels depends.

• Clay is fashioned into vessels; but it is on their empty hollowness, that their use depends.

• The door and windows are cut out (from the walls) to form an apartment; but it is on the empty space (within), that its use depends.

মোল্লা স্যার এত কিছু ভাবতেন কিনা জানিনা। কিন্তু ‘গোল্লা’ উনার সবচেয়ে প্রিয় শব্দের একটি। শিক্ষকরা দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করে কিছুটা বোধ হয় স্যাডিস্ট হয়ে যায়। কেউ গোল্লা পেতে পারে এই আনন্দে মোল্লা স্যারকে যেরকম উচ্ছসিত দেখতাম সেটা ভয়াবহ। এই একটা শব্দ ছিল তার প্রিয় কৌতুক আর আনন্দের বিষয়। হাসতে হাসতে বলতেন ‘পরীক্ষায় গোল্লা পেলে কিন্তু খাতা বালিশ গোল করে বিদায়!’

আমার জীবনে প্রথম দিনই যেমন একটা ঘটনা ঘটে গেল, মোল্লা স্যারের জীবনেও এরকম একটি ঘটনা আছে। স্যারের ট্রান্সফার হয়েছে। প্রথম দিন স্যার ক্লাস নিতে ঢুকেছেন। এক হাতে চক, অন্য হাতে ডাষ্টার নিয়ে দুলতে দুলতে হাসি মুখে ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ির মধ্যে থেকে খুব নাটকীয়ে ভঙ্গিতে বললেন ‘ আমার নাম নুরুজ্জামান মোল্লা’ একটি ছেলে পেছন থেকে বলল ‘আমি একটি ছড়া বলবো’ ক্লাসে হাসির রোল পড়ে গেল।

আমাদের ছোটবেলায় বিটিভি-তে নতুন কুঁড়ি নামে বাচ্চাদের একটা অনুষ্ঠান হতো। খুবই জনপ্রিয় এই অনুষ্ঠানে ছড়া বলার সময় বলতে হতো ‘আমার নাম ……আমি একটি ছড়া বলবো’ বাচ্চারা এই কথাটা বলতো একটু টেনে টেনে, মজা করে। মোল্লা স্যারের নাম বলার মধ্যে সেই ব্যাপারটা ছিল, বেচারা ক্যাডেট দ্বিতীয় লাইনটা বলার লোভ সামলাতে পারল না। কি আর করা, মোল্লা স্যার ডাষ্টার দিয়ে পিটিয়ে সেই ছেলের মাথা ফাটিয়ে দিলেন। রক্তারক্তি কারবার। তাকে হাসপাতালে এডমিট করে দেয়া হয়েছিল।

ডাস্টার দিয়ে পিটিয়ে হাসপাতাল পাঠান একটা সাধারণ ঘটনা ছিল। আমারটা সে তুলনায় ডালের সাথে ভাত খাওয়ার চেয়েও সহজ, ভাতের সাথে নুন খাওয়ার মত ঘটনা।

 

তিন

ক্লাস এইটে কে সায়েন্স পড়বে কে আর্টস পড়বে এটা নির্ধারণের জন্য মোল্লা স্যার একটি বিশেষ পরীক্ষার ব্যবস্থা করলেন। সাত বছরে আমার দেখা মোল্লা স্যারের সবচেয়ে আনন্দিত সময়। কে কে গোল্লা পাবে এই ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত। গোল্লা পাবার পর কি কি হবে সেই বর্ণনায় তিনি মুখর। পরীক্ষা যত কাছে আসতে লাগল তার আনন্দ তত বাড়তে লাগল।

সব ছেলেরা, বিশেষভাবে আমার মত খারাপ ছাত্ররা পুলসিরত পার হবার আশংকায় ডায়রিয়া হয়ে যাবার জোগাড়। যদিও আমার জীবনে খুব বেশি এম্বিশন কখনই ছিলনা, সায়েন্স বা আর্টস কোনটাই আমার জন্য কোন ব্যাপার না। সমস্যা হল আমার সায়েন্স পড়ার যোগ্যতা নেই বলে আমাকে আর্টস পড়তে হচ্ছে এই জিনিষ হজম করা কঠিন ছিল। যথা সময় পরীক্ষা হল। প্রশ্নপত্র দেখে মাথাঘুরে পড়ে যাবার মত অবস্থা। পরীক্ষা খুব খারাপ দিয়ে, মুখ কালো করে হল থেকে বেড়িয়েছি। নিজের উপর রাগ লাগতে লাগল, সারা জীবন পড়াশুনা কিছুই করলাম না। এক ধরনের অপমান এবং অপরাধবোধে ডুবে গেলাম।

পরীক্ষার পর পরই ছুটি। ঢাকাতে এলাম। একদিন উনাকে মোল্লা স্যারের গল্প বললাম, আর্মি অফিসারের এইচএসসি পাশ করা লোকের সন্তান বলায় যে কত অপমান বোধ করেছি, এটা বললাম।

ক্যাডেট কলেজের শিক্ষকদের মধ্যে ডিফেন্স অফিসারদের প্রতি তীব্র ঘৃণা কাজ করে। ক্যাডেট কলেজগুলো ডিফেন্সের টাকায় চলে, শিক্ষকদের নিয়োগ হয় আর্মি হেডকোয়ার্টারের তত্বাবধানে। কলেজে শিক্ষকদের সুযোগ সুবিধা অতুলনীয়। সৎ পয়সায় জীবন যাপন করার জন্য আদর্শ চাকুরী। তারপরও এটা কি করে মজ্জাগত হয়ে গেল কে জানে! আমি সিওর ক্যাডেট কলেজগুলো পরিচালনা করার পিছনে ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি-র কিছু ব্যাপার কাজ করে। অথচ এইসব স্ট্র্যাটিজিস্ট-রা জানেই না, তাদের ক্যাডেট-রা প্রশিক্ষিত হচ্ছে কিছু ব্যক্তির মাধ্যমে যারা তাদের ঘৃণা করে।

আমার বাবা সব শুনলেন কিছুই বললেন না। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় শিক্ষকদের বাব-মার উপরে স্থান দেয়া হয়েছে সবসময়। বাবা-মা যতই শিক্ষিত হোননা কেন, এবং শিক্ষক যতই জটিল হননা কেন, অবস্থানের নড়চড় হয়না। সুতরাং আমাকে ক্যাডেট কলেজে শিক্ষকদের অনেক ভালদিক দেখালেন। এরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবার যোগ্যতা রাখেন এটা বিশেষভাবে বোঝালেন। মোল্লা স্যার যে আমাদেরকে সন্তানের মত দেখেন, এবং সেই অধিকারে এসব বলেন এটা বোঝালেন। আমি বাবার প্রতিক্রিয়া দেখে হতাশ।

বেশ কয়েক বছর পরের কথা। আমাকে উনি ডেকে উনার বড় কাঠের বাক্স থেকে উনার সার্টিফিকেট দিলেন। আর বললেন ‘সব গুণী মানুষই ভুল করতে পারেন। প্রতিটি ডিফেন্স অফিসার-কে একাডেমি-তে থাকতেই ব্যাচেলর ডিগ্রি নিতে হয়। এটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমার মাষ্টার্স করার সার্টিফিকেট। তুমি আমার মার্কশিট দেখতে পার, পজিশনটা দেখলে তোমার ভাল লাগবে’।

তারপর একটু থেমে বললেন, একজন ডিফেন্স অফিসারকে সারা জীবন পড়াশুনার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, সেই পড়াশুনা বেশিরভাগ মিলিটারি আইন, ন্যাশনাল ষ্ট্র্যাটিজি, ট্যাক্টিক্স, যুদ্ধবিদ্যা, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান বিষয়ক হলেও, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা বিষয়েও আকাশ্চুম্বি ট্রেইনিং একজন অফিসারকে তৈরি করে। বললেন পিএসসি এবং এনডিসি করার গল্প। আমার মন থেকে অনেকদিনের একটা ভার নেমে গেল।

রেজাল্ট দিয়ে শেষ করি। মোল্লা স্যারকে দারুন হতাশ করে দিয়ে পাশ করলাম আমরা তিনজন- তারেক মন্সুর, আমি আর রেজওয়ান। ৩৩ জন পেয়েছে শূণ্য। বাকিরা ১ থেকে ৩৯।

৪০ পয়সার ঋণ খেলাফি।

সূত্রঃ ০১-ঋণ নেয়া ।

খুব স্পষ্ট করে দিন তারিখ সংখ্যা মনে নেই। অপরাধের কথা লিখতে বসে মনে হলো মনের গহীনে লুকিয়ে রাখা কষ্টের কিছুটা যদি বলা হয় মনের ভার অনেক খানি নেমে যায়। স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট কাউন্সিলর, মনোবিদ, মানসিক ডাক্তার এবং মুরুব্বীরা বলেন শুধুমাত্র বলতে পারলে মনের অর্ধেক কষ্ট কমে যায়। “শেয়ারড সরো ইজ হাফ সরো”।

ঘটনাটি ২০০২ এর কোন এক সময়ের হবে বোধহয়। আমার এক কলিগ এবং বন্ধুর মা খুব অসুস্থ, তিনি মায়ের চিকিৎসার জন্য লোন নেবেন। বাংলাদেশের একটি নামকরা এনজিও’র নাম ব্যবহার করে সেই ব্যাংকটি তখন চুটিয়ে ব্যবসা করা শুরু করেছে। সারা বাংলাদেশের সব এলিজিবল লোকজনকে লোন দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে বিশাল অংশ নিচ্ছে। লোন দেয়ার বিষয়গুলো এত দ্রুত এবং সহজ করে ফেলেছে যে, যে কোন লোক বিপদে পড়লে কিংবা কোন একটি বিলাস দ্রব্য কেনার ইচ্ছা হলেই তার ব্যাংকের কথা মনে পড়ে যায় এবং সে একটি লোন নিয়ে ফেলে।

কেউ কেউ আজকাল ব্যাংকগুলোকে নব্যমহাজন নামে ডাকেন। আমার অবশ্য সুদের কারবারি বলতে বেশি ভালো লাগে। আগের মহাজন আর বর্তমান মহাজন-দের কাজকর্ম চরিত্র একই হলেও একটি বড় পার্থক্য আছে। ‘আগের মহাজনদের দুটো পা ছিল’। সে সব মহাজনরা গ্রামের মহল্লার ধনী ব্যক্তি ছিলেন। কৃষক-রা খুব বিপদে পড়লে গিয়ে তার দুটো পা জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চাইতে পারতো। সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি, অন্দরমহলের চুরির টুং টাং তাদেরকে প্রভাবিত করতে পারতো। কোন কোন মহাজনের আবার হৃদয়ও ছিল আবেদনকারী বাড়তি সময় কিংবা সুদ মওকুফ পেয়ে যেতেন।

বর্তমান মহাজনদের সারাদেশ জুড়ে অফিস, শত শত, হাজার হাজার হাত, বিপদে পড়া মানুষ মাফ পাওয়ার জন্য তাদের “পা” খুঁজে পায়না। ‘কাষ্টমার সার্ভিস’ বলে একটি আপাত ‘পা’ দৃশ্যমান হয়ে উঠলেও সেই পা ক্ষমা করার অধিকার রাখেনা, কারণ সেই পা’এর সাথে হৃদয়ের কোন সম্পর্ক নাই। আগের মহাজন ‘জন’ ছিলেন এখনকার সুদের কারবারিরা ‘ব্যাংক’। মানুষের হৃদয় থাকে, প্রতিষ্ঠানের থাকে সিস্টেম সুতরাং বলা যায় এখনকার মহাজনদের নির্দিষ্ট কোন ‘পা’ নেই। হৃদয় থাকারতো কোন কারণই নেই। বর্তমানকালে সিএসআর (কর্পোরেট সোশ্যাল রেপন্সিবিলিটি) নামে একটি হৃদয় নামক বস্তু তৈরির চেষ্টা হচ্ছে, সমস্যা একটি-ই সেই বস্তুটি প্লাষ্টিকের তৈরি। তাতে মমতা থাকে না, থাকে মার্কেটিং নামের ভয়াবহ একটি সংক্রামক রোগ। অন্যদিন এই দুটি বিষয়ে আলোচনা করা যাবে। আজ বরং নিজের অপরাধের কথা বলি।

আমার সেই কলিগের একজন গ্যারান্টর লাগবে আমি সাথে গিয়েছি। কাষ্টমার সার্ভিসেস ম্যানেজার আমাদের সাথে অত্যন্ত ভাল আচরণ করলেন, আমরা রীতিমত মুগ্ধ। আমার লোনের প্রয়োজন নেই, কিন্তু কি করে কি করে আমাকেও কনভিন্স করে ফেললেন। আমি আচরণে মুগ্ধ হয়ে লোনের আবেদন করলাম, উনি বললেন আপনি ক্রেডিট কার্ডের উপর লোনের আবেদন করেন পেতে সুবিধা হবে। আমি তাই করলাম। ৩ দিন বলা হলেও ১০ দিনের মাথায় মোটামুটি আমাদের লোন এসে গেল। ১২ টি ব্ল্যাঙ্ক চেকের পাতা সাইন করে আরো কি কি যেন দিলাম।

আমার একাউন্ট চেক করে দেখলাম টাকা ৪.৫%  কম এসেছে। জানতে চাইলাম। কি ব্যাপার। সে বললো এমনতো হবার কথা না ! প্রোসেসিং ফি একটা আছে কিন্তু সেটাতো অনেক কম ! এখন মনে নেই ১ কিংবা ১.৫ % ছিল তখন । ‘ভাই চিন্তা করবেন না আমি আপনাকে জানাচ্ছি, দুটো দিন সময় দিন’ ।

কিছুদিন পর ম্যানেজার সাহেব আমাকে সরি বললেন। ক্রেডিটকার্ডে লোন নিলে ৪.৫ % দিতে হবে। এক লক্ষ টাকায় ৪৫০০ টাকা কম পেলাম। একটা একাউন্ট খুলতে হয়েছিল সেখানেও কিছু টাকা দিতে হয়েছে ।  যাই হোক টাকা পয়সা, কম-বেশি আমার কাছে কখনোই খুব একটা জরুরী ছিলনা।

সব ঠিক ঠাকই চলছিলো। আমি হঠাত চাকুরী বদলে ঢাকা চলে এলাম। ব্যাংকে যোগাযোগ করলে তারা বললেন এটা কোন সমস্যা নয় আমাদের অনলাইন ব্যাংকিং, আপনি আপনার কাছের ব্রাঞ্চে জমা দেবেন। আমি শুনে আনন্দিত হয়ে ঢাকায় চলে এলাম। টাকা পয়সা ধার করা এবং তা শোধ দেয়ার ব্যাপারে আমার সব সময়ই একধরণের সমস্যা কাজ করে। যে ব্যক্তি ধার নিয়ে ঠিক তারিখে শোধ দেয়না, এবং পরিস্কার ভাবে বলেনা কি তার সমস্যা আমার মানদন্ডে সে একজন খারাপ মানুষ। আমি খুব সচেতন ভাবে এই ক্রিয়া এবং তার সাথের প্রক্রিয়াকে ঘৃণা করেছি ছোটবেলা থেকে।

আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। আমার বাবার কিছুদিন পর পর বদলী হত। আমি স্কুল থেকে এসে দেখলাম বাসার সামনে একটি ট্রাক দাঁড়ানো এবং আমাদের মালপত্র সব তোলা হয়েছে। অর্থাৎ আমাদের বদলি হয়েছে কোথাও। আমার বাবা তার অফিসের গল্প কোনদিন আমাদের সাথে করেন নি। কোন ক্ষোভ কোন আনন্দ কিছুনা । আমি এসে গাড়ীতে উঠলাম। আমি কোথায় যাচ্ছি জানিনা। আমার স্কুলের বন্ধুদের কাছে বিদায় নেয়া হয়নি।

স্কুলে আমাকে এক চটপটি ওয়ালা বিচিত্র কারণে স্নেহ করতেন। সেদিন আমি দু’টাকা প্লেটের স্পেশাল ফুল প্লেট চটপটি খেয়ে এসেছি। পয়সা ছিলনা, কিন্তু দেখে লোভ হচ্ছিল। সব কিছু ছাপিয়ে আমার কেবলি মনে হতে লাগলো আমিতো টাকাটা দিয়ে আসতে পারলাম না। আব্বুকে বললে এই সমস্যার সমাধান হয় যায় বা যেত এখন বুঝি। সে সময় আব্বুকে আমি আসমান জমিনে সবচেয়ে বেশি ভয় পেতাম। কেন পেতাম জানিনা। তিনি জীবনে খুব একটা মারেননি। সারা জীবনে দু-একবার চর থাপ্পরের কথা মনে পড়ে। রাগ হয়েছেন খুবি কম কারণ এক বাসায় থেকেও আমার সাথে সপ্তাহে একবার দেখা হতনা। আমার ভেতরেই বিচিত্র কোন ব্যাপার হয়তো ছিল, ঠিক জানিনা।

আমি ১০ বছর পর সে টাকা ফেরত দেয়ার জন্য সেই চটপটি ওয়ালাকে খুঁজতে শুরু করেছি। যখন পেলাম তার ছেলে চটপটি বিক্রি করছেন তখন, তার বাবা মারা গেছেন বেশ কয়েক বছর আগে। গল্পটা এজন্য করলাম ঋণের ব্যাপারে আমার এক ধরণের এলার্জি আছে। এলার্জি’র বাংলা কি হওয়া উচিত? অতিসংবেদনশীলতা? কে জানে আমি বাংলা, ইংরেজী কোনটাই ভালো জানিনা।

সেই অতিসংবেদনশীলতা বা এলার্জির কারণেই আমি সব সময় কিস্তির চেয়ে বেশি টাকা জমা দিতাম। ৫০ কিস্তির লোন ছিল, ৪৭ কিস্তি দেয়ার পর একদিন লোন-কালেকশন বিভাগ থেকে এক ব্যক্তি ফোন করলেন। করে বললেন আপনি টাকা পয়সা ঠিকমত দেননা কেন? আমি বললাম দেখুন আমার ৫০ কিস্তির লোন ৪৭টি দেয়া হয়েছে। তিনি বললেন না একটা কিস্তি মিস আছে দিয়ে দেবেন। আমি বললাম সরি আমি ঠিক জানতাম না কোন ফাঁকে মিস হয়ে গেছে, আমি সামনের মাসেই দুই কিস্তি একসাথে দিয়ে দেবো। সে বলল না কালই আপনি দিয়ে দেবেন। আমি বললাম ঠিক আছে। কিন্তু ভাই যে লোক ৪৭ কিস্তি ঠিকমত দিয়েছে সে বাকী তিন কিস্তিও দেবে এটুকুতো আপনি বোঝেন, এতটা রূঢ় না হলেও পারতেন। একটা ‘রিমাইন্ডার-ই” যথেষ্ট ছিল। সে উত্তর করলো ‘আপনিতো কোন সময়ই টাকা পয়সা ঠিকমত দেননা’। এই বলে বিচিত্র ভঙ্গিতে কুৎসিত ভাবে হেসে উঠলো। আমি বললাম ‘আপনি জানেন না আপনি কার সাথে কথা বলছেন’ অর্থ করতে চাইলাম ‘একজন সৎ’ মানুষের সাথে কথা বলছেন ! সে স্বাভাবিকভাবেই অন্যকিছু বুঝলো যে আমি ক্ষমতা দেখাচ্ছি। তারপর যা হলো আমি শুধু বিস্মিত হলাম। বাংলাদেশে বেসরকারি চাকুরেদের কোন ক্ষমতা থাকেনা। অসৎ হতে ক্ষমতা লাগে, সৎ হতে ক্ষমতা লাগেনা। সুতরাং সব সৎ মানুষই আসলে ক্ষমতাহীন অক্ষম মানুষ।

আমি একদিকে বেসরকারি চাকুরে, তার উপর সৎ মানুষ, মানে ডাবল “অক্ষম” মানুষ। খুব কষ্ট পেলাম, পেয়ে একটা চিঠি লিখলাম ঐ ব্যাংকের এইচআর বিভাগ এবং কাষ্টমার সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্টে। তাঁদের ধন্যবাদ তারা ফোন করে ক্ষমা চাইলেন। তারপর ফোন করলেন কালেকশন বিভাগের প্রধান। তিনি সেদিনকার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন। তার কন্ঠে কেমন একটা বাঁকা ভাব ছিল। কথাগুলো ছিল এমন আপনার সাথে এমন কিছু হয়নি, যাইহোক যদি কিছু হয়ে থাকে তাহলে যেন ভুলে যাই। আমি বললাম আপনাদের রেকর্ডিং ফ্যাসিলিটি নাই? কি কথা হয়েছে শুনে নিন। সে বলল না এখনো হয়নি। তারপরই সেই কুৎসিত হাসি আমি বুঝলাম এই সেই লোক যার সাথে আমি কথা বলেছিলাম। বললাম শোনেন ভাই, আমরা ছোটখাট চাকুরী করি, টাকা মেরে দিয়ে কোথায় যাব? তাও ৪৭ কিস্তি দেবার পর? যারা টাকা মেরে দেবার জন্য নেয় তাদের কাছ থেকে টাকা উঠায়ে দেখান। আপনি তাদের ফোন করার সাহসও রাখেন না। বলে আমি ফোন রেখে দিলাম।

যে ব্যাংকার আমাকে ফোন দিয়েছিল তাকে ফোন দিলাম, জানলাম কালেকশন বিভাগ, প্রথমে বিরক্ত করে, তারপর মাস্তানি করে, তারপর অফিসে গিয়ে অপমান করে, সামাজিকভাবে হ্যারাস করে, রাস্তাঘাটে উত্যাক্ত করে, মাস্তানি করে এমনকি হিজড়া পাঠিয়ে সারাদিন বাসার সামনে নাচ-গান, খিস্তি-খেউড়ও করার উদাহরণ আছে।

আমি বললাম ঠিক আছে কিন্তু আমার সাথে কেন? আমিতো টাকা দিচ্ছি ! সে দুদিন সময় নিল। তারপর যা জানলাম আমি তাতে লজ্জিত হলাম কারণ ভুল আমরা, বিরাট ভুল। আমি ২৮ নম্বর কিস্তি (এখন মনে নেই) মিস করেছি। আমি বেশিরভাগ সময় মাস ঠিক রেখে দিতাম না, এডভান্স দিতাম, কিস্তির চেয়ে বেশি টাকা দিয়ে রাখতাম, সুতরাং মিস হবার সুযোগ ছিলনা, ঐ নিয়ে ভাবতামও না। এখন কি হয়েছে আমি যখন ২৯ নম্বর দিচ্ছি ওরা ধরে নিচ্ছে ওটা ২৮ নম্বর। এবং আমি ২৯ নম্বর খেলাফি। আবার যখন আমি ৩০ নম্বর দিচ্ছি ওরা সেটা ২৯ নম্বর ধরে নিচ্ছে, আমি ৩০ নম্বরের খেলাফি। এই ভাবে আমি আসলে প্রতিমাসেই একজন কালপ্রিট এবং আমার অপরাধের কোন সীমা নাই। আমি কালেকশন বিভাগের প্রধানের কথা কিছুটা বুঝতে পারলাম।

আমি লোন দাতা ম্যানেজার সাহেবকে বললাম কিন্তু একটা রিমাইন্ডার দেয়া যেত যে এই আপনার সমস্যা সমাধান করেন ! আর আমি যে অতিরিক্ত টাকা দিলাম সেগুলো গেলো কই? সে বলল একাউন্ট মেন্টেনেন্স ফি আছে, লেট ফি আছে, লেজার ফি আছে আরো কতো কি, আপনার সব টাকাতো লেট ফি দিতে দেতেই গেছে। তারপর অনলাইনে টাকা পে করছেন সেখানে ফি আছে…………আরো কতোকি! রিমাইন্ডার না দিয়া ভালোই করছে, করলে এত টাকা কাটবো ক্যামনে?

সূত্র ০২ – আমি ঋণ খেলাফী।

৫০ তম কিস্তি দেয়ার পরে এই ব্যাংকের উপর আমার মন এতটাই বিগড়ে গেছিল যে আর যাব রুচি হচ্ছিল না। যদিও আমার এক ব্যাংকার বন্ধু বলেছিল গিয়ে একাউন্টটা ক্লোজ করে দিতে। ২০১২ সালে একটা কাজের জন্য কয়েক জন বন্ধু আবার লোন চাইলো, তারা পে করবে শুধু আমার নামে লোনটা নেবে, যেহেতু আমার কোথাও কোন লেনদেন নেই। নিজের বাড়িতে থাকি, বাবা’র একটা পরিচয় আছে, একটি মাত্র ভাই বিদেশে খবু ভাল অবস্থানে আছে, স্ত্রী ডাক্তার আমার লোন না পাওয়ার কোন কারণতো নেই। ও ভালো কথা আমার চাকুরীতে উন্নতি হয়েছে আমিও একটি নামি কোম্পানিতে মোটামুটি ভাল বেতনে মধ্য পর্যায়ে চাকুরীরত। সুতারং ওরা আমাকেই ধরলো। আমি লোনের কথা বলতেই সেই ব্যাংক ঝাঁপিয়ে পড়লো লোন দেবার জন্য। ১০ দিনে লোন দেবার কথা, তারা ২০ দিন যায় হচ্ছে, হবে, ৪০ দিন যায় সবাই পালিয়ে বেড়ায়।

আমি এক কথার মানুষ, না দেন বলে দেন দেব না, তাও বলে না। কি যন্ত্রণা ! আমি যখন খুব জেদ ধরলাম ঐ ব্যাংক থেকে সব টাকা তুলে নিলাম তখন তাদের ভেতরে একজন বলল। স্যার আপনার সিআইবি খারাপ এসেছে। আমি বললাম আমার সিআইবি খারাপ আসার কোন কারণ থাকতে পারেনা। কথাটা আমাকে বললে আমি সমস্যা সমাধান করবো কিন্তু এটা কি ধরণের আচরণ? তিনি বললেন লজ্জায় কেউ আপনার সাথে কথা বলতে পারছিলনা। একজন উর্ধতণ কর্মকর্তাকে কি করে আমরা বলি তার সিআইবি রিপোর্ট খারাপ? আমি বারবার প্রশ্ন করেও কোন সদুত্তর পেলাম না কোন ব্যাংক আমার নামে অভিযোগ করেছে।

এক ব্যাংকার বন্ধু বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগাযোগ করতে বলল, সেখানে আমার বিশেষ পরিচিত একজন কাজ করে, তার সহযোগিতায় জানলাম আমি কোথাও থেকে লোন নিয়েছিলাম সেই লোন আমি পরিশোধ করিনি। লোন জীবনে একবারই নিয়েছি সুতরাং সেই ব্যাংকে যোগাযোগ করলাম।

কাষ্টমার সার্ভিসেস এর বিশাল লাইন পার করে দিয়ে যখন সেখানে পৌঁছাতে পেরেছি তখন সেই অফিসার আমার একাউন্ট খুঁজে পাচ্ছিলেন না, কারণ তাকে শুধু নাম আর ব্রাঞ্চ দিয়ে খুঁজতে হয়েছে আমি একাউন্ট নম্বর দিতে পারিনি। অন্য একজনের সহযোগিতায় যখন পেলাম, আমি জানতে চাইলাম আমার সমস্যা কি? উনি একটু হেসে বললেন সমস্যা একটাই আপনি একাউন্ট ক্লোজ করেননি। আমি বললাম কিন্তু টাকাতো পরিশোধ করেছি ! উনি বললেন সব পে করার পর আপনার ৪০ পয়সা বাকী ছিল। বললাম খুব ভালো কথা আমিতো সব সময় অতিরিক্ত পে করেছি তাহলে বাকী থাকে কি করে? অনেক চার্জেস আছে। তাছাড়া আপনি সময়মতো টাকাও পরিশোধ করেননি। একটি কিস্তি নিয়ে অনেকদিন ঝামেলায় ছিলেন। আমি তাও মেনে নিলাম কিন্তু একটা ফোন করে আমাকে জানানো হলনা কেন? যাই হোক ২৫০০ টাকা দিয়ে সেই একাউন্টের লেনদেন শেষ করেছি।

সূত্র-০৩-অপরাধ অনেক করেছি এবার শাস্তির পালা।

সব ক্লিয়ার হয়ে যাওয়ার পর একটি ব্যাংক আমাকে লোন দেবার জন্য উঠে পড়ে লাগলো, অন্য একটি ব্যাংক ক্রেডিট কার্ড দিতে চায়। যথারীতি এবারো তারা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, কোন ঝামেলায় বাড়ি চলে গেছেন আরো কত কি। বুঝলাম ঝামেলা কিছু একটা আছে। আবার যোগাযোগ করলাম এক বন্ধুর সাথে তিনি বললেন বাংলাদেশ ব্যাংকে রিপোর্ট আছে আমি “লো প্রায়রিটি কাষ্টমার” সুতরাং আমাকে লোন বা কার্ড দেয়া হবেনা। আমি এবার অবাক হলাম।

আবার খোঁজ নিলাম, ৪০ পয়সার ঋণ খেলাফি এত বাজে লোকের সাথে কি কেউ কথা বলতে চায়? অনেক কষ্টে যা জানলাম তা হলো সেই ব্যাংকের এক কিস্তি করে আমি অনেক কিস্তি মিস করেছি সুতরাং ব্যাংকটি আমার নামে অভিযোগ করেছে আমি পেমেন্ট নিয়ে সব সময় গাফিলতি করি। তার উপর বিভাগীয় প্রধানের নামে করেছি অভিযোগ শাস্তি আমার পাওনা।

আমার অনেকদিনের সুনামে কালিমা লেগে গেল। এখন আমি একজন ঋণ খেলাফি। সুতরাং সাবধান ! !

আরেকটি ছোট কথাঃ

একটি টিএনটি ফোন নিলাম বাসায়। কিছুদিন পর সেই ফোনে ফোন আসে আর আমার স্ত্রী-কে উত্যাক্ত করে। একদিন আমি বাসায়, বার বার ফোন আসছে। আমি ফোন ধরলাম বললাম আপনি আমার স্ত্রী-কে বিরক্ত করছেন ক্যানো? মেয়েদের কন্ঠ শুনলে হুস থাকেনা? সে শুরু করলো এইভাবে আপনার স্ত্রী-র মত ঐ রকম মাগী রাস্তা ঘাটে অনেক আছে……………” বাকীটা লেখা সম্ভব নয়। এক পর্যায়ে বুঝলাম ফোনটি যিনি আগে ব্যবহার করতেন তিনি একজন চাকুরিজীবি, হঠাত চাকুরি চলে যাওয়ায় লোন পরিশোধ করতে পারেননি। ব্যাংকের যন্ত্রণায় ফোন বদলেছেন।

গালিগালাজ একটু কমলে আমি বললাম ভাই আমি সেই ব্যক্তি নই, এই ফোন আমি নোতুন নিয়েছি। কে শোনে কার কথা, প্রতিদিন আমার ওয়াইফ-কে জ্বালাতন করেই চললো। সেই ফোন লাইনটি আমি কেটে রেখে দিলাম। ব্যাংক সেই একই।

উপসংহারঃ

আমরা যারা এইসব ব্যাংক থেকে লোন নেই তারা কি জানি আসলে কত পার্সেন্ট লোন আমাদের দিতে হয়? ধরুন আমি ১ লক্ষ টাকা লোন নিয়েছি ১২% সুদে। তাহলে তিন বছর মেয়াদি লোন হলে আমাকে ৩৬০০০/- শোধ করতে হবে। খুবি সোজা অংক।

সমস্যা হলো অন্যখানে। আপনি হিসাব করছেন ১ লক্ষ টাকায় ১২% সুদ। কিন্তু প্রথম মাসেই আপনি কিস্তি পরিশোধ করেছেন আনুমানিক ৩৭৭৮/-। তাহলে আপনি আসলে ১ লক্ষ টাকা ব্যবহার করেছেন মাত্র ১ মাস। ৩৫ তম মাসে আপনি ব্যবহার করেছেন মাত্র ২৭৭৮/-টাকা আপনি সুদ দিয়েছেন কিন্তু ১ লক্ষ টাকার উপর।

আসলে আপনাকে যে সুদের হিসাব দেয়া হয় সেটা সরল সুদের হিসাব। ইফেক্টিভ রেট কত হয় জানলে ফিট হয়ে যাবেন। তার উপর প্রসেসিং ফি দিচ্ছেন। এটা সেটা বুজরুকি চার্জের অভাব নেই। আর যদি দু’ চারটা কিস্তি মিস করতে পারেন আপনি আমার মতই একজন ঋণ খেলাফিতে পরিণত হবেন।

%d bloggers like this: