সুমেরিয়ান মিথ অনুযায়ী মানুষ সৃষ্টির রহস্য।

সুমেরিয়ান ট্যাবলেটের অনুবাদ  থেকে যেসব তথ্য পাওয়া যায় তার ভেতর একটি হলো সৃষ্টি তত্ব। খুব বিস্ময়কর হলেও সত্য যে এই তত্বের সাথে জেনেসিস এবং বাইবেলে প্রাপ্ত তত্বের সাথে ঘনিষ্ট মিল খুজে পাওয়া যায়। সুমেরিয়ান সৃষ্টি রহস্যকে দুইভাগে ভাগ করা যায়।

একঃ পৃথিবী সৃষ্টির রহস্য।

দুইঃ মানুষ সৃষ্টির রহস্য।

সুমেরিয়ান ট্যাবলেট অনু্যায়ী ‘আনুনাকি’ শব্দের মানে “আকাশ থেকে আগত”। এই এইলিয়েনরা নিবিরু নামের একটি গ্রহ থেকে পৃথিবীতে আসে স্বর্ণ সংগ্রহের জন্য। নিবিরু’র জলবায়ুতে কিছু সমস্যা দেখা দিলে গ্রহটি ক্রমশ বসবাস করার অনুপযোগী হয়ে পড়ছিল। গ্রহকে বসবাস উপযোগী রাখার জন্য তাদের প্রচুর স্বর্ণের প্রয়োজন দেখা দেয়। সুমেরিয়ান ট্যাবলেটের লেখায় পাওয়া যায় ভিনগ্রহ থেকে আগত এই মহাকাশচারীগন মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে স্বর্ণের সন্ধান পায় এবং স্পেসপোর্ট, মিশন পরিচালনা কেন্দ্র এবং ইরিদু নামে একটি শহর সেখানে প্রতিষ্ঠা করে। আনুনাকিদের রাজা লর্ড আনু’র নির্দেশে পরে তারা মংগলগ্রহে একটি রিলে সেন্টার এবং চাঁদেও নানা স্থাপনা তৈরী করে।

আনুনাকি মহাকাশচারীরা সোনার খনিতে কাজ করতে করতে একটি পর্যায়ে কায়িক শ্রমে বিরক্ত হয়ে বিদ্রোহ করে বসে এবং কাজকর্ম বন্ধ করে দেয়। লর্ড আনু এবং তার দুই ছেলে এনলিল (Enlil) এবং এনকি (Enki) পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেন তারা একটি দাস শ্রেণী তৈরী করবেন, যারা শারীরিক শ্রমের কাজকর্মগুলো করবে এবং অন্যান্য কাজ যেমন নিরাপত্তা প্রদান করবে। এনকি (Enki) ছিলেন পৃথিবী গ্রহের দায়িত্বপ্রাপ্ত। তিনি ছিলেন মহাজ্ঞানী দার্শনিক এবং বিজ্ঞানী। তার উপর দায়িত্ব দেয়া হয় এই দাস সৃষ্টি করার। এনলিল (Enlil) শুরু থেকেই এর তীব্র প্রতিবাদ করতে শুরু করলে বিষয়টি আনু’র গোচরে আনা হয়। আনু তার কাউন্সিলের সাথে আলাপ করে দাস তৈরীর সিদ্ধান্ত নেন, কারণ নিবিরুকে বাঁচানোর আর কোন পথ নেই। গর্ভধারণ ও জন্মদানের দেবী নিনমাহকে মা-দেবীও বলা হয়। তিনি শুরু থেকেই মানব জন্মের পক্ষে ছিলেন, এমনকি তিনি দাস না বলে এই নতুন সৃষ্টিকে সহকারী বলার পক্ষপাতি ছিলেন। আনু’র কাছ থেকে অনুমতি পাওয়ার পর এনকি (Enki) মানুষ সৃষ্টিতে নিনমাহ’র সাহায্য নিয়ে কাজ শুরু করেন।

প্রথমদিকে পৃথিবীর মানুষের কাছাকাছি একটি প্রানীর ডিম্বানু এবং আনুনাকি শুক্রাণুকে টেষ্টটিউব পদ্ধতীতে নিশিক্ত করে পৃথিবীর ঐ মানুষ সদৃশ প্রানীর গর্ভে স্থাপন করা হয়। কিন্তু এই পদ্ধতীতে বার বার বিকৃতি আসতে থাকে। আনুনাকি-রা জিন (Gene) পরিবর্তন করার কৌশল জানতো। যদিও প্রথম দিকের মানুষের কাছাকাছি প্রানীরা গায়ে গতরে অনেক বড় এবং শক্তিশালী ছিল কিন্তু তাদের বুদ্ধিবৃত্তি ছিল খুব নিম্নস্তরের। এই নিম্ন স্তরের প্রানীদের দিয়ে উন্নত কাজ যেমন পশুপালন, কৃষি উৎপাদন এবং নতুন পণ্য তৈরীর কাজ করা সম্ভব ছিল না। তাছাড়া তারা অনেক ক্ষেত্রে কানে শুনতো না বা কথা বলতে পারতো না। আনুনাকিদের এমন এক শ্রেনীর দাস প্রয়োজন ছিল যারা ভাবের বিনিময় করতে পারে, নির্দেশ গ্রহণ করতে পারে এবং শৃংখলা বজায় রাখতে পারে।

এনকি (Enki) ছয়বারের চেষ্টায় মানুষের সাথে আনুনাকি-দের ডিএনএ এর সফল মিক্সিং করেন। বলা হয় ৮০% প্রাক্তন মানুষ সদৃশ প্রানির ডিএনএ এবং ২০% আনুনাকি ডিএনএ এর শংকর করে তিনি সফল হন এবং প্রথম মানুষ (Homosapience) আদামু-কে সৃষ্টি করেন। সে হিসেবে আদামু ছিল প্রথম পরিপূর্ণ মানুষ।

আদামু-কে তৈরী করতে এনকি (Enki) ক্রিস্টালের টেষ্ট টিউব পরিবর্তণ করে মাটির তৈরী টেষ্টটিউব ব্যবহার করেন এবং আনুনাকি গর্ভে ৯ মাস রাখার সিদ্ধান্ত নেন। নিনমাহ স্বেচ্ছায় একাজে সম্মত হন এবং নয় মাস তাকে গর্ভে ধারন করেন। ৯ মাস পর বাচ্চা প্রসব করলে এনকি (Enki) উচ্ছসিত হয়ে পড়েন এবং বলেন আমার নিজের হাতে তৈরী। সম্পুর্ন আনুনাকিদের মত দেখতে একটি পুরুষ শিশুকে সৃষ্টি করতে পেরে এনকি এবং নিন্মাহ খুব-ই খুশী হন। পার্থক্য একটি-ই লিঙ্গের মাথায় একটু চামড়া ঝুলছিলো যেটা আনুনাকি-দের মত নয়। নিনমাহ মাটি থেকে তৈরী বলে তার নাম দেন আদামু।

এই সৃষ্টিকে সার্থক করার জন্য মাটি ছাড়াও আনুনাকি ডি এন এ প্রয়োজন হয়, সেকারণে একজন ইগিগি (আনুনাকি পাইলট) কে হত্যা করে তার জমাট রক্ত ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বার বার দাস তৈরী করতে আনুনাকি গর্ভ ব্যবহার করতে হবে এটি অবাস্তব মনে হলে এনকি (Enki) ও নিনমাহ প্রথম নারী মানুষ তৈরী করার সিদ্ধান্ত নেয়। এবারে অবশ্য ডিএনএ/জিন এর জন্য আদামু’র লিংগের চামড়া কেটে সেই রক্ত ব্যবহার করা হয়। এনকি (Enki) তার স্ত্রী’র কাছে প্রস্তাব রাখেন মেয়ে বাচ্চাটি গর্ভে ধারন করবার জন্য। নয় মাস পর সুন্দর ফুটফুটে একটি মেয়ে বাচ্চা জান্মালে তার নাম রাখা হয় তিয়ামাত।

তিয়ামাত শব্দের অর্থ “Mother of life” বা জীবনদায়িনী। ইংরেজীতে যা ইভ  এবং হিব্রুতে “হাওয়া”। এভাবে অন্য আনুনাকিদের গর্ভে আরো সাতটি মেয়ে বাচ্চা জন্ম দেয়া হয়। আদামু এবং তিয়ামাত প্রথম পরিপূর্ণ মানুষ এই বিবেচনায় তাদেরকে ইরিদু রাজ্যের ‘দ্য সিটি অব এনকি’তে ইডেন নামক স্থানে রাখার সিদ্ধান্ত হয়। সেখানে তাদের জন্য ঘর এবং বাগান তৈরি করা হয়।

ইডেন শব্দের অর্থ সমতল্ভূমি। এই শব্দটি প্রথম লিখিত হয় সুমেরিয়ান ‘গিলগামেশ উপকথায়’।  ‘গার্ডেন অব ইডেন’ বলতে এখানে ‘দেবতাদের বাগান’ বোঝানো হয়েছে। এই বাগানটির সঠিক অবস্থান কোথায় তা বলা না থাকলেও সেটি টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিস নদীর মাঝে গড়ে ওঠা সমতলে অবস্থিত বলে উল্লেখ আছে।

এতকিছুর পর সবাইকে হতাশ করে দিয়ে নতুন জন্মানো নর-নারী-রা গর্ভধারণ এবং বাচ্চা জন্মদানে ব্যর্থ হয়। এনকি এবং নিন্মাহ “হাউস অব হিলিং”-এ (সম্ভবত আজকের দিনের হাসপাতাল) এই সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ করতে শুরু করে। তারা মানব দেহে প্রাণ এবং তার বংশগতি নিয়ে গবেষনা করে দেখতে পান দ্য ট্রি অব লাইফ’ (প্রাণবৃক্ষ) এ মোট ২২ টি শাখা রয়েছে। কিন্তু আনুনাকিদের এই ২২ জোড়া’র পরও আরও এক জোড়া শাখা রয়েছে, আদামু বা তিয়ামতের যা নেই। ঘর থেকে সবাইকে বের করে দিয়ে, দরজা বন্ধ করে তারা এবিষয়ে পরামর্শ করেন এবং এনকি’র পাজরের হাড় থেকে প্রানারস নিয়ে আদামু’র পাজরে স্থাপন করেন। অন্যদিকে নিনমাহ-এর পাঁজর এর হাড় থেকে প্রানরস নিয়ে তিয়ামাত এর পাজরে স্থাপন করা হয়। দুজনের “ট্রি অব লাইফে” এভাবেই দুই জোড়া নতুন শাখা বা ক্রোমসোম সংযুক্ত করা হয়। মানুষের মোট ক্রমসোম সংখ্যা দাঁড়ায় ২৩ জোড়া।

কিন্তু এই পরিবর্তনের ফলে আদামু এবং তিয়ামাত তাদের লজ্জা স্থান সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠেন। তিয়ামাত গাছের পাতা দিয়ে তার লজ্জাস্থান ঢাকার ব্যবস্থা করেন। একদিন এনলিল প্রচন্ড গরমে বাগানে ঘুরতে আসলে আদামু এবং তিয়ামাত-কে গাছের পাতা দিয়ে লজ্জাস্থান ঢাকা্রত দেখে বিস্মিত হন। তিনি এনকি’র কাছে এর ব্যাখ্যা চাইলে এনকি তার এক্সপেরিমেন্ট এবং মানুষের সন্তান জন্মদানের অক্ষমতা এবং নতুন ক্রমোজম সংযোজনের কথা তাকে জানান।

এনলিল এটা শুনে রাগে ফেটে পড়েন এবং আদামু ও তিয়ামাতকে গার্ডেন অব ইডেন থেকে বের করে দিয়ে খনি শ্রমিক হিসাবে নিয়োগদান করার নির্দেশ দেন।


১/ সুমেরিয়-সভ্যতা।

2/ সুমেরিয়ান ট্যাবলেটঃ যেভাবে চিনি এই সভ্যতাকে।

Advertisements

সুমেরিয়ান ট্যাবলেটঃ যেভাবে চিনি এই সভ্যতাকে।

পৃথিবীতে ব্যাখ্যাহীন প্রযুক্তি, নির্মান এবং বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক নিদর্শন যখন পাওয়া যায় আমরা অবাক হই এবং বিভিন্ন ধরনের হাইপোথিসিস রচনা করতে শুরু করি। মিশর ও মেক্সিকোর পিরামিড, বলিভিয়ার পুমা পুংকু, পেরুর নাজকা লাইন, মেগালিথিক এবং মনোলিথিক নিদর্শন সমূহ, গোবেকলি টিপে, হরপ্পা, মহেঞ্জেদারো, আর্ক অব কভেনেন্ট, ভয়নিক মেনুস্ক্রিপ্ট, নুহু নবীর নৌকা,  তিওতিকান, মারকাহুজি, চাচাপয়াস সংস্কৃতি, কৈলাস পর্বত, ইলোরা বা অজন্তার গুহাসহ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য অব্যাখ্যাত নিদর্শন। এসবের কোন সঠিক ব্যাখ্যা বর্তমান বিজ্ঞান অথবা মুল্ধারার নৃতত্ববিদদের কাছে নেই। তারা যে জানেনা তা নয়, তারা জানাতে চায়না। যখন কেউ কোন হাইপোথেসিস দাড় করায় এই মূল্ধারার মূল কাজ হয়ে উঠে তাকে হাস্যকর প্রমান করা কিংবা ভুল প্রমান করা। কেন মানব জাতিকে ওরা এইসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা থেকে সরিয়ে রাখতে চায় তার কারণ আমরা ধীরে ধীরে বুঝতে পারবো কিন্তু তার আগে আমাদের জানা প্রয়োজন বিস্ময়কর এবং ঐতিহাসিক সুমেরিয়ান ট্যাবলেট সম্পর্কে। 

সুমেরিয়ান কিউনিফর্ম ট্যাবলেট।

অস্টিন হেনরি লেয়ার্ড ১৮৪৯ সালের দিকে রাজা অসুরবানিপাল এর প্রাসাদ থেকে সুমেরিয়ান ট্যাবলেট খুঁজে পান। বৃটিশ এই নৃতত্ববিদকে আবিস্কারক হিসাবে সব ক্রেডিট দেয়া হলেও তিন বছর পরে তার সহকারী জনাব হরমুজ রাসাম একই সাইট থেকে দ্বিতীয় দফায় আরেকটি পাঠাগার খুঁজে পান। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত মোট ট্যাবলেটের সংখ্যা প্রায় ৩১০০০। বর্তমানে এই সব ট্যাবলেট বৃটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। কিউনিফর্ম পদ্ধতিতে লেখা এই মাটির গ্রন্থগুলোকে অনুবাদ করা ছিল একটি কঠিন প্রক্রিয়া । বর্তমানে প্রায় ২০০ গবেষক সুমেরিয়ান ট্যাবলেট পড়তে এবং বুঝতে পারেন।

কি আছে এই ট্যাবলেটে?

২০১৬ সাল। শত শত মিডিয়া পৃথিবীব্যাপী প্রচার করলো সুমেরিয়ান ট্যাবলেট-এর বর্তমান অনুবাদের বিস্ময়কর দিকগুলো। বর্তমান সভ্যতা জানতো যে সুমেরিয়ানরা মহাকাশ বিজ্ঞানে অনেক এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু তারা এর আগে ধারনাও করতে পারেনি সেটা কতটা। এখানে প্রমাণ পাওয়া যায় যে প্রায় 2,000 বছর আগে, প্রাচীন ব্যবিলিয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা রেনেসাঁ-যুগের পণ্ডিতদের মতো উন্নত ছিল।

যদিও কিউনিফর্মে লেখা এই মাটির ট্যাবলেট মূলত হিসাবরক্ষণের কাজে ব্যবহার হলেও কিছু কিছু শিলালিপি রয়েছে যা প্রাচীন মেসোপটেমীয়দের জীবনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ ধারন করে। এছাড়াও রয়েছে অপ্রত্যাশিত অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন আইন, বিজ্ঞান, গনিত। তাদের বিদ্যা এতই উচ্চ স্তরের ছিল যে, বৃহস্পতি গ্রহের কক্ষপথ এবং গতি নির্ণয় করা খুবই সাধারণ বিষয়ের একটি। বর্তমানে আমরা যে প্রক্রিয়া শিখেছি মাত্র ৫০০-৬০০ বছর আগে।

 খ্রিস্টপূর্ব ৩২০০-এ প্রাচীন শহর উরুকে সুমেরীয় শাসকদের দ্বারা প্রথম এই ট্যাবলেট লেখার কাজ শুরু হয় বলে প্রমান পাওয়া যায়। এছাড়াও সেসময় আকাদিয়ান ভাষার ব্যবহার দেখা যায় যা অ্যাসিরিয়ান এবং বাবিলীয় সাম্রাজ্যের প্রচলীত ভাষা ছিল। কিউনিফর্মের জায়গায় বর্ণমালা ব্যবহার শুরু হয় প্রথম খৃষ্টাব্দে। সেই তখন থেকে উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত এই ভাষা এক রকম হারিয়ে যায়।

১/ সুমেরিয়-সভ্যতা।

সুমেরিয় সভ্যতা।

পৃথিবীর সবচেয়ে পুরানো দিনগুলিতে আমরা কোন প্রশ্নের উত্তর খুঁজি না। আমরা খুঁজি বর্তমানে কারন বর্তমান মানেই আধুনিক, বৈজ্ঞানিক এবং সামনের। অতীত আমাদের সামনে ধোঁয়ার মত, পচা, গলা, অবৈজ্ঞানিক, অশিক্ষা, বন-জংগল, গুহা-মানব। আগের দিনের রাজা বাদশাদের বিরাট ইমারতগুলো আমাদের শুধু নিকট ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয় গৌতম বুদ্ধের ‘অনিচ্য’ বা নশ্বরতা’র কথা। এছাড়া এগুলো থেকে আমাদের গ্রহন করার কিছু নেই। বাড়ির পাশে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কেমন লোক ছিলেন আমরা নিশ্চিত জানিনা। হিন্দুদের ইতিহাসে একরকম লেখা, মুসলমান লেখকদের আরেক রকম আবার বৃটিশ বেণিয়া লিখেছে আরেকভাবে।

‘পৃথিবীর ইতিহাস রচনা করেছে বিজয়ীরা, কিন্তু ইতিহাসের আড়ালেও একটি ইতিহাস থাকে, সেটি সত্যিকারের গণমানুষের ইতিহাস” ইতিহাসের  বইয়ে চোখ রাখলে সেখানে শুধু যুদ্ধ আর যুদ্ধ। যে পরাজিত তার লেখার সুযোগ কোথায়? সুতরং যিনি জিতে গেলেন তিনি এক গন্ডা ভাড়াটে লেখককে দিয়ে নিজের বিজয়ের মহিমা লিখিয়ে নেবেন এটাই সংগত। ভাগ্যক্রমে যদি  এই লেখা পরবর্তি কোন বংশ বা আগ্রাসী রাজার হাত থেকে বেঁচে যায় আমরা পাই এক বিজয়ী রাজার এক পাক্ষিক জয়ের গল্প। আর যদি এগুলো পরবর্তি বিজয়ীদের হাতে আসে, তাহলে আবার বিকৃত হয়, হতেই থাকে।

তাই আজকের ইতিহাস ঠাকুর মা’র ঝুলি ছাড়া কিছু নয়। কার্ল মার্ক্স তাই ইতিহাস পড়ার একটি নিয়ম শিখিয়ে দিয়েছেন, ‘ঐতিহাসিক ভাবে আমরা যদি কট্টর দৃষ্টি গ্রহণ করতে পারি, সত্যের কিছুটা কাছাকাছি যেতে পারি’। বলা হয় আমরা যে ইতিহাস জানি সেটা ভুল ইতিহাস। বলা হয় মানুষের আসল ইতিহাস লুকিয়ে রাখা হয়েছে মানুষের কাছ থেকেই, এবং এই কাজও কিছু মানুষেরই। কি কারনে বলা মুশকিল তবে ঠিক এরকমটি হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে পুরাতন সভ্যতা ‘সুমের’ সম্পর্কে। পৃথিবীতে এর চেয়ে পুরানো সভ্যতা থাকলেও থাকতে পারে কিন্তু তার প্রমাণ অটুট নেই, যেরকমটি আছে ‘সুমের’ সম্পর্কে।

প্রাচীন মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে প্রথম সুমেরিয়ান সভ্যতার সুচনা ও বিকাশ ঘটে। সহজ করে বললে আজকের ইরাক এবং তার আসে পাশের কিছু অঞ্চল যেমন সিরিয়া ও তুরস্কের কিছু এলাকা নিয়ে এই মেসোপটেমিয়া। টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিস নদীর মাঝে গড়ে ওঠা দ্বীপটিতে সভ্যতার প্রথম প্রদীপটি জ্বলে ওঠার কারণ নিয়ে অনেক মতভেদ আছে, কিন্তু উঠেছিল যে সে সম্পর্কে কোন দ্বিমত হবার সুযোগ এখন আর নেই। 

খ্রিস্টপূর্ব ১০০০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ সালে এই সভ্যতার বিকাশ ঘটে বলে প্রমান পাওয়া গেছে। তার মানে ছয় থেকে বারো হাজার বছর আগে আমাদের এই পৃথিবীতে একটি উন্নত সভ্যতার বিকাশ ঘটে। কিন্তু মানুষ যখন গুহায় বাস করে, কৃষিকাজও শেখেনি সেই তখন আধুনিক এই সভ্যতা কি করে গড়লো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে নানা জটিলতা তৈরী হয়। তাই আমাদের অতি ক্ষমতাশীল সরকার ব্যবস্থা, মুলত যারা এই গ্রহ পরিচালনা করেন তারা সিদ্ধান্ত নিলেন এসব আমাদের (আমজনতার) না জানাই ভাল। কার ভালো তা কেউ জানেনা তবে পরিচালকদের জন্য ভাল এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।

বিগত ১৫০ বছরে ফ্রেঞ্চ এবং বৃটিশ আরিকিউলজিস্ট রা খুজে বের করেন উন্নত এই সভ্যতাকে। মানুষ বিস্ময়ের সাথে জানতে পারে সভ্যতার শুরুর ব্যখ্যাহীন ইতিহাসের কথা। এই প্রথম মানুষের কাছে মিশরের পিরামিড, মহেঞ্জেদারো, হরোপ্পা, গ্রিক দেব দেবী, হিন্দু দেব দেবী, ব্যবিলন এবং রোমের গড দের জন্ম এবং জ্বীন, দাজ্জাল সহ সকল ধর্মের রহস্য উন্মোচিত হতে শুরু করে একের পর এক।

যেরকম ভাবা হত সভ্যতার জন্ম গ্রিস থেকে, তা নয়, তার চেয়েও উন্নত সভ্যতার অস্তিত্ব পৃথিবীতে ছিল এটি জানার পর চমকে যায় পৃথিবী। টাইগ্রিস এবং ইউফ্রটিস নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সুমেরিয় সভ্যতায় প্রথম কৃষি কাজের সূচনা ঘটে। এই নদী দুটি যেমন পরিবহন সুবিধা দিয়েছে, তেমনি দিয়েছে মৎস্য আহরণ কেন্দ্রিক অর্থনীতি। সাত-আল-আরাব অঞ্চলের সমতলে এই জীবন যাত্রা গড়ে উঠলে দেখা যায় তারা পরবর্তী কালের কৃষি নির্ভর এলাকার মত প্রকৃতি নির্ভর নয়। তারা পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাবিত করবার মত জ্ঞান এবং সামর্থ্য রাখতো।

বিকেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থা ও সেবা, নগর পরিকল্পনা, লেখনী ও লিপি, ধর্মচর্চা, ব্যবসা-কেন্দ্র, বাণিজ্য পথ, বাড়ি এবং ভবন নির্মান সহ সকল প্রকার আধুনিক ব্যবস্থার সূচনা ও প্রসার হয়েছিল এখান থেকে। সুমেরিয়ান-রা এতটা উন্নত ছিল যে নদীতে বাধ নির্মাণ করে পানিকে ইচ্ছে মত প্রবাহিত করার প্রযুক্তি ও জ্ঞান তাদের ছিল। ঘরকে ঠান্ডা রাখার, বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা সহ নগর সৌন্দর্যের প্রতিও তারা যত্নশীল ছিল। মেয়েরা সোনা রূপা সহ অনেক ধরনের অলংকার পড়তো সে সময়, সে সব ডিজাইন এবং নান্দনিকতায় উন্নত ছিল।  

সুমেরিয়ানদের লিখিত এবং অলিখিত আইন কানুন ছিল এবং একে অপেরর সাথে লিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ হতো। বিংশ শতাব্দির শুরুর দিকে পারস্যের শহর সুসা’য় নৃতত্তবিদ্গন ব্যবিলনের রাজা হামুরাবি’র পাথরটি আবিস্কার করার পর দেখা গেল সকল প্রকার আইন কানুন এবং নীতিমালা এই পাথরটিতে খোদাই করা রয়েছে। ২৮২ টি অনুচ্ছেদে ভাগ করা এই আইন শীলাটি খ্রিশটপুর্ব ১৬৯৪ দশকের বলে ধারনা করা হয়। আইনে বিবাহ, বানিজ্য, সম্পদের উত্তরাধিকার থেকে শুরু করে সব ধরনের দৈনন্দিন বিষয় স্থান পেয়েছে। যেমন অনুচ্ছেদ ১৯৬ তে বলা আছে ‘চোখের বদলে চোখ’, পরবর্তিতে নবী মুসা’র সময় এই আইন দেখা যায় এবং অনেকের কাছেই এই আইন এখনও পরিচিত হবার কথা। সুমেরিয়ান সভ্যতার প্রধান শহর ছিল ৪টি গিরসু, নিপার, উরুক এবং অর।

2/ সুমেরিয়ান ট্যাবলেটঃ যেভাবে চিনি এই সভ্যতাকে।

আন্দোলন।

[লেখাটি সাম্প্রতিক ডট কম  এ ছাপা হয়েছে]

“The life of a student is a life of preparation for the struggle of life…”

জোরে জোরে পড়া শুরু করলাম যাতে সবাই শোনে। রিকশায় আমরা, তাতে কী! একটু পরে পরীক্ষা। অনুবাদ অংশটা তো পড়ি নাই কেউ। প্রথম লাইন পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধুম ধুম করে মাথায় স্কেলের বাড়ি পড়ল। কাঠের স্কেল দিয়ে কেউ মাথায় মারে! মাথা ফেটে গেলে কী হইত? রিকশায় আমার সিটের ওপরে বসা জিনাপ। ওই-ই ওর স্কেলটা দিয়ে সমানে আমাকে মেরে যাচ্ছে। ওর সবচেয়ে অপ্রিয় সাবজেক্ট এই বাংলা দ্বিতীয় পত্র। ও বলে, বাংলা ব্যকরণ পড়ার চেয়ে নাকি এইডস হওয়া ভাল!

এই রিকশায় আমরা যেই চারজন বসা—আমি, রিকি, কলি, জিনাপ—এই চারজনই বাংলা দ্বিতীয় পত্র সাবজেক্ট ঘৃণা করি, তবে বাংলা পড়ার চেয়ে এইডস হওয়া ভাল কিনা এই বিষয়ে আমাদের বাকি তিনজনের মনে একটু সন্দেহও আছে। তাই আমি ছাড়া বাকি দু’জন, রিকি আর কলি, মারধর না করলেও সমানে জিনাপকে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে, মার, মার, ওকে আরো মার।

আমরা চারজন মিলে এই উঁচু-নিচু রাস্তাওয়ালা চট্টগ্রাম শহরে একটামাত্র রিকশায় চড়ে স্কুলে যাচ্ছি! দ্বিগুণ ভাড়ায় এক রিকশা নিয়ে, দুইজন রিকশার সিটের উপরে আর দুইজন নিচে বসার একটাই উদ্দেশ্য, মন খুলে হা হা হি হি করা! এই সময়ে আমি ছাত্রজীবনের বোরিং অনুবাদ পড়তে গেলে এরা মানবেই বা কেন?

আমার অনুবাদ পড়ার কোনো দরকার নাই। আমি যথেষ্ট ভাল ইংরেজি পারি। তবু পড়তেছিলাম আমার এই বান্ধবীদের সুবিধার জন্যই। যতই ঘৃণা করি না কেন, একটু পরেই বাংলা দ্বিতীয় পরীক্ষা আর সেটা সবাইকে দিতে হবে, পাস করতেও তো হবে। এরা যেহেতু চায় না তো পড়ে আর কী হবে! বই বন্ধ করে যার বই তার হাতে দিয়ে দিলাম। বইয়ের মালিক, মানে রিকি, বইটা স্কুল ব্যাগের মধ্যে রেখে দিল।

তখনই আমি চিৎকার করে উঠলাম—কীরে, ব্যাগ নিলি কেন? আজকে থেকে তো স্কুল ব্যাগ নেওয়া নিষেধ!paromita-heem-andolom-2

আমাদের সরকারি স্কুল। কয়েক বছর পর পর হেডমিস্ট্রেস বদলায়। নতুন হেডমিস্ট্রেস আসছে কিছুদিন হইল। তার চোখ খারাপ, খুব মোটা লেন্সের চশমা পরে। ওই চশমার ভেতর দিয়ে তার দুইখান চোখের দিকে তাকালে মনে হয় চোখের জায়গায় যেন দুইটা ডিম বসানো। তার চেহারাও খুব খারাপ, মুখের চামড়া ঠাকুরমার ঝুলির ডাইনি বুড়ির মত কুঁচকানো।

তবে সবচেয়ে খারাপ তার মুড। সে আমাদের স্কুলের মেয়েদেরকে দুই চোখে দেখতে পারে না। প্রতিদিন নতুন নতুন নিয়মকানুন করে। আজকে এইটা করা যাবে না তো কালকে সেইটা করা যাবে না। আজকে খোপা করা নিষিদ্ধ, কালকে বেণী করা নিষিদ্ধ। ক্লাসের টাইমে বাথরুমে যাওয়া নিষিদ্ধ। ক্লাসের শেষে চুল আঁচড়ানো নিষিদ্ধ। এরপর স্কুলে চিরুনি আনাই নিষিদ্ধ। মেয়েরা সাজগোজ করলে উনার এত জ্বলে কেন কে জানে! জিনাপ জোক করে বলে, উনি নাকি একদিন নিয়ম করবে—‘ক্লাস টাইমে নিঃশ্বাস নেওয়া নিষিদ্ধ’।

যাই হোক, আজকে থেকে উনার নতুন নিয়ম—পরীক্ষার সময় কোনো ধরনের ব্যাগ, পলিথিন, ফাইল নেওয়া যাবে না।

নিয়মকানুন মানানোর জন্য মহিলা কী রকম যন্ত্রণা করে আমি জানি। তাই প্রবেশপত্র, পেনসিল, কলম, স্কেল এইগুলা আমি আমার স্কুলের জামার পকেটে নিছি। আর ওরা তিনজন প্রতিদিনের মত যার যার ঢাউস সাইজের স্কুল ব্যাগ নিয়ে আসছে। হেডমিস্ট্রেস সব ক্লাসে নিজে গিয়ে পই পই করে বলে আসছে: “পরীক্ষার সময় স্কুলে কোনো ধরনের ব্যাগ আনা যাবে না।”

এরপরেও স্কুল ব্যাগ আনার দরকার কী?

বললাম। কেউ আমার কথা পাত্তাই দিল না। উল্টা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করল। মেরিল পেট্রোলিয়াম জেলি, পাউডার, কাজল, টিস্যু, পানির বোতল, ছোট স্কেল, বড় স্কেল, লাল-নীল-সবুজ কলম—এইগুলা না নিলে ওরা স্কুলে সারভাইভ করবে কেমনে?

কলি বলল, নানা রঙের কালি দিয়ে রচনার প্যারার নামের নিচে দাগ দিতে হবে। তাহলে নাম্বার বেশি দিবে। আর ‘১ নং প্রশ্নের উত্তর’, ‘২ নং  প্রশ্নের উত্তর’ এইগুলা লিখতে হবে নীল কালি দিয়ে, তাহলে খাতাটা দেখতে সুন্দর হবে।

কলির কথা পাত্তা দেই না। সে আন্সারই করে ৬০ নাম্বার। ৪০ নাম্বার ছেড়ে আসবে। ওর এইসব ডিজাইন করার সময় আছে, আমার নাই।

রিকি বলল, কলম যদি স্কুলের জামার পকেটে নিই তাহলে পাছা দিয়ে কালি বের হয়ে আমার জামার বারোটা বেজে যাবে। কে পরিষ্কার করবে ওই জামা? ওই ডাইনি হেডমিস্ট্রেস?

সঙ্গে সঙ্গে জিনাপ বলল, পেন্সিল পকেটে নিলেও তো রানের মধ্যে গুঁতা খেয়ে ইনজুরড হয়ে যাব, তখন কে লাগাবে মলম ওখানে, ‘মাই হেড-মিস-স্ট্রেস’?

বলেই তিনজন আমার দিকে তাকায়ে এমনভাবে হো হো করে হাসতে থাকল যেন আমি হেডমিস্ট্রেস এর চামচা! আমার কী যায় আসে! ওরা স্কুল ব্যাগ নিয়ে যাবে নাকি স্যুটকেস নিয়ে যাবে সেটা ওদের ব্যাপার—আমার তাতে কী?

স্কুলে পৌঁছে গেলাম। প্রতিদিনের মত সেদিনও আমাদের স্কুলের লম্বা লম্বা বারান্দার গ্রিলের সাথে ব্যাগ, পলিথিন এইসব ঝুলানো। নতুন নিয়ম কেউ পাত্তা দেয় নাই। আমার বান্ধবীরাও ওই সারি সারি ব্যাগের মধ্যে তাদের স্কুল ব্যাগ রেখে পরীক্ষা দিতে চলে গেল। আমিও গেলাম।

পরীক্ষার এক ফাঁকে জানালা দিয়ে বারান্দায় অপরিচিত নড়াচড়া চোখে পড়ল। ভাল করে তাকায়ে দেখলাম ওইখানে ঝুলানো সব স্কুল ব্যাগ, পলিথিন আমাদের স্কুলের আয়ারা নিয়ে যাচ্ছে। আমি ফিস ফিস করে সামনের সারিতে বসা জিনাপকে ডাকলাম। ইশারায় দেখালাম বারান্দার কাণ্ডটা। জিনাপ জিহ্বা বের করে মুখ ভেঙচাল। তারপর ফিস ফিস করে বলল, আমার ব্যাগ নিয়ে কবরে যাবে হারামজাদি।

রিকি কলির পরীক্ষার সিট পাশের রুমে। ওরা পরীক্ষা শেষে এসে দেখে পুরা বারান্দা সাফ। কোনো ব্যাগ-বুগ সেইখানে নাই। অন্য মেয়েরাও সবাই হতবাক। ব্যাগ গেল কই? ব্যাগে বাসায় ফেরার ভাড়া আছে। আরো কত কী আছে! এখন এরা বাসায় যাবে কেমনে?

খুঁজতে খুঁজতে ব্যাগ পাওয়া গেল। নিচতলার বাথরুমের সামনে একটা পরিত্যক্ত রুমে আটকানো। বাইরে মান্ধাতার আমলের বিশাল এক তালা। রুমের ভেতরে নানা রকমের স্কুল ব্যাগ আর হাবিজাবি শপিং পলিথিন যেনতেন অবস্থায় রাখা। ওই রুমের একমাত্র জানালা দিয়ে সবাই উঁকিঝুঁকি দিয়ে নিজের ব্যাগ খুঁজতেছে। রুমের বাইরে বিভিন্ন ক্লাসের মেয়েদের বিশাল জটলা। স্কুলের কোনো আয়া কিংবা কর্মচারিদের কাউকে ধারে কাছেও ঘেঁষতে দেখা গেল না।

প্রথমে সবাই কানাকানি শুরু করল, এই নতুন প্রিন্সিপাল কত খারাপ!

—ডাইনি একটা। শাকচুন্নি। পেত্নি।

— প্রিন্সিপাল না এইটা প্রিন্সি-বাল।

কিছুক্ষণ পরই এই ফোঁসফোঁসানি গর্জনে রূপ নিল। সবাই হই হই হই হই করতে থাকল। আমার বান্ধবী রিকি, কলি, জিনাপ পড়ল মহাবিপদে। সঙ্গে আমিও সেমি-বিপদে। আমরা চারজন এক রিকশায় বাসায় ফিরি। ওরা যেতে না পারলে আমি কী করে যাই? তাই আমি স্কুল ব্যাগ ফেরতের দাবিতে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিলাম।

প্রথমে হুংকার ছেড়ে বললাম, আমরা এতগুলা স্টুডেন্ট সবাই মিলে দরজায় ধাক্কা দিব। দরজার তালা ভেঙে আমরা আমাদের ব্যাগ মুক্ত করে আনব।

মেয়েদের চুলের ক্লিপ, সালোয়ারের সেফটিপিন দিয়ে তালা খোলার চেষ্টা করা হইল। তালার মন গলল না। তারপর ক্লাসরুম থেকে লম্বা বেঞ্চ এনে সবাই মিলে দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা দিল। তাতে প্রাচীন, পুরাতন, মহীয়সী স্কুলের প্রাচীন, পুরাতন, গম্ভীর তালা—ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে দাঁড়ায়া থাকল। একটুও টলল না।

এক ঘণ্টা কেটে গেছে। গরমে সবাই হাঁপাচ্ছে।

আমি ঘোষণা দিলাম, আর নয় দরজা, এইবার কাচের জানালা ভেঙে ফেলব। জানালার গ্রিলের ফাঁকে বাঁশ ঢুকায়ে সব স্কুল ব্যাগ উদ্ধার করা হবে। যেই কথা সেই কাজ। বলা মাত্র কোথা থেকে বড় বড় ইট এনে ছুঁড়ে মারল জানালার কাচে। এই নিউ জেনারেশন এঁটেল মাটির ভিজা ভিজা ইটে ওই বহু শতাব্দী পুরানা কাচের টিকিটাও নড়ল না।

সবার কাঁদো কাঁদো অবস্থা। তিন ঘণ্টার পরীক্ষা শেষে এক ঘণ্টা শারীরিক কসরৎ, তার ওপর ব্যাগের টেনশন। সবাই ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত, বিপর্যস্ত। আমি সমবেত জনতাকে আবার পুনরিজ্জীবিত করলাম। আমরা এইবার মিছিল করব। মিছিল করতে করতে আমরা হেডমিস্ট্রেস এর রুমে ঢুকে আমাদের দাবি জানাব।

শুরু হইল মিছিল। আমি সবার সামনে।

স্লোগান ধরলাম, ‘আমাদের ব্যাগ, আমাদের ব্যাগ!’

পেছন থেকে সবাই বজ্রকণ্ঠে—‘দিতে হবে, দিতে হবে!’

আমার বামে রিকি, ডানে কলি, আর পেছনে কমপক্ষে একশ মেয়ে। সে কী টান টান উত্তেজনা! এ যেন ১৯৫২ সালের ভাষার দাবিতে ছাত্র আন্দোলন! আনন্দে আমার লাফাইতে মন চাইল। শরীরে রক্ত যেন টগবগ করে ফুটতেছে! আন্দোলন করতে এত মজা!

যেতে যেতে টিচার্স লাউঞ্জের সামনে আসামাত্র উত্তেজিত জনতার উত্তেজনা কেমন যেন কমে গেল। বাঘের গর্জন হঠাৎ হয়ে গেল মিউ মিউ রূপ। আমি জনতার স্পিরিট ধরে রাখার জন্য আরো জোরে জোরে স্লোগান দিতে দিতে হেডমিস্ট্রেস এর রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়া গেলাম।

কারণ আমি ঢোকার আগেই চেঁচামেচি শুনে উনি রুম থেকে বের হয়ে আসতেছিলেন। আর তখনই চোখের বাম ও ডান কোণা দিয়ে ইঁদুর ছুটে যাওয়ার মত কী কী যেন দৌড়াতে দেখলাম। কানে শুনলাম অনেকগুলা পায়ের দৌড়ে পালানো জুতার খস খস শব্দ। নিজের কানকে বিশ্বাস না করে একবার ডানে, একবার বামে তাকালাম। কোথাও কেউ নাই। সাহস করে পেছনে তাকালাম। পুরা প্যাসেজ খা খা করতেছে। কোনো জনমানব নাই সেখানে। ধুলার মধ্যে অনেকগুলা কেডসের ছাপ এলোমেলো পড়ে আছে।

দুরু দুরু বুকে সামনে ফিরলাম। আমার চোখের সামনে হেডমিস্ট্রেস এর কুঁচকানো চামড়া, যুগলবন্দি ভ্রু। মোটা লেন্সের অস্বচ্ছ কাচের পেছনে দুইটা ঘোলা ঘোলা ডিম অথবা চোখ।

এইবার নিজের চোখকে বিশ্বাস না করে কোনো উপায় নাই। আমিও রুদ্ধশ্বাসে দৌড়াবো কিনা ভাবতেছি, এমন সময় উনি বাজখাই গলায় বললেন, কী ব্যাপার? তুমি এখানে কেন? এইখানে এত চেঁচামেচি কীসের?

যেন আমি বাঘের খাঁচার সামনে দাঁড়ানো ছিলাম। হঠাৎ শিক গলে বাঘ বের হয়ে আমাকে বলল, কী খবর তোমাদের?

আমি মিন মিন করে বললাম, আমার ব্যাগটা ওই রুমে আটকানো, বড়আপা। বাসায় যাবার রিকশা ভাড়া তো ওইখানে। বাসায় যাব কীভাবে?

উনি চিৎকার করে ডাকলেন, প্রদীপ, প্রদীপ।

প্রদীপদা আসল। আর আমাকে দেখে মুচকি মুচকি হাসল। ততক্ষণে অন্য টিচাররাও টিচার্স রুম থেকে বের হয়ে আসল। আর আমাকে দেখে হাসতে হাসতে একজন আরেকজনের গায়ে ঢলে পড়ল। আরো কত কী রঙ-ঢঙ করল! আমি চোখের কোণা দিয়ে সব দেখলাম।

আমাকে টিপ্পনি কাটল কেউ কেউ, কীরে নেতা, তোর পিছের লোক কই? বিপ্লবীরা সব কই গেল?

লজ্জায়, অপমানে আমার চেহারা একবার লাল, একবার বেগুনি, একবার নীল তখন।

হেডমিস্ট্রেস বললেন, প্রদীপ ওর ব্যাগটা কোথায় আছে, ওকে দিয়ে দাও।

প্রদীপদা মান্ধাতা আমলের চাবির গোছা নিয়ে আগায়ে আসল। আমি তার পিছে পিছে হাঁটতে শুরু করলাম। আমার পিছে পিছে হাঁটতে হাঁটতে শুরু করল স্কুলের অ্যাসিস্টেন্ট হেডমিস্ট্রেস মানে ছোটআপা।

আমাকে ওই রুমের সামনে নিয়ে যাওয়া হইল। আমি শেষবারের মত মনে মনে বললাম, তোমার দোহাই লাগে হে ধরণী, দ্বিধা হও।

কেউ দ্বিধা হইল না। তবে ধাঁধায় পড়ল প্রদীপদা নিজেই। এক গোছা চাবির ভেতরে কোনটা যে এই রুমের তালার চাবি সেইটা খুঁজতে খুঁজতে ঘাম ছুটে গেল উনার। পরে সিদ্ধান্ত নিলেন যে সবগুলা চাবি দিয়েই ট্রাই করে দেখবেন কোনটা দিয়ে তালাটা খোলে।

আমার বুকে তখন ধড়াস ধড়াস শব্দ হচ্ছে। মনে মনে চাচ্ছিলাম ছোটআপা এই দীর্ঘ তালা খোলা প্রক্রিয়ায় না থেকে উনার রুমে চলে যাক। না, তাও হইল না। একটা করে চাবি ওই প্রাচীন তালার ভেতরে ঢোকানো হয়, আর আমার বুকের ভেতরে একটা করে মোচড় পড়ে। আমি যত ধর্মের যত ধরনের দোয়া জানি সব মনে মনে পড়তে শুরু করলাম। আর ভগবানের ঠ্যাং ধরে ঝুলে থাকলাম। আমার চারপাশে ছায়াদের গুঞ্জন। দূরে কোন চিপাচুপা থেকে  উঁকি দিয়ে আমার বান্ধবীরা আমার অবস্থা বোঝার চেষ্টা করতেছে।

হঠাৎ ক্যাঁক শব্দ করে তালাটা খুলে গেল। তালা খুলে রুমের ভেতরে আমাকে নিয়ে গেল প্রদীপদা।

বলল, খুঁজে নাও, কোনটা তোমার ব্যাগ? তারপর তাড়াতাড়ি বাসায় যাও। অনেক লেইট হইছে।

আমার পেছনে তখন অ্যাসিস্টেন্ট হেডমিস্ট্রেস ওরফে ছোট আপা দাঁড়ানো। যেন মাথার পিছনে বন্দুক ধরে আছে সরকার নিয়ন্ত্রিত বাহিনি। আর সামনে অসংখ্য প্রতারক, পলায়নপর বিপ্লবীর সারি সারি স্কুল ব্যাগ।559315_423984217643469_465037760_n