উপহার ৩।

উপহার ১ এবং ২ লেখার পর মহাবিপদে পড়েছি। আমার আত্মিয় বন্ধু দাওয়াত দিয়ে বলে “তুই আসিস, গিফট আনতে হবে না”। এছাড়াও নানা রকম যন্ত্রণা আছে। আমার লেখা উপহারের বিরুদ্ধে না, বুঝতে পারছি যা বোঝাতে চেয়েছি তা পারিনি। পন্ডিত ব্যক্তিরা অল্প কথায় আসল ব্যাপার বোঝাতে পারে, যেমন আমার মূল বক্তব্য এক লাইনে পরিস্কার বলে দিয়েছেন মাদার তেরেসা।

“It’s not how much we give but how much love we put into giving.”

― Mother Teresa

আগের দিনে উপহারে দেয়া হত ফুল আর বই। ফুল কিনতে হয় এটা আমরা অনেক বড় হয়ে শিখেছি।  বাগান-লন-পথ-ঘাট-বন-বাদাড় এবং অন্য মানুষের বাসায় ফুল ফুটে থাকবে কারণে অকারণে ছিঁড়বো এটাই ছিল স্বাভাবিক। একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা দিবসে শহীদ মিনারে যেতাম সবাই। তখন নিরাপত্তার এত অভাব ছিলনা। নোংরা রাজনীতি এসব মহান জাতীয় অনুষ্ঠান থেকে দূরে থাকতো। এখন গিজ গিজ করে র‍্যাব, পুলিশ, গোয়েন্দা, তাদের হাতে অত্যাধুনিক্ সরঞ্জাম, অস্র, কমিউনিকেশন ডিভাইস, সারভিলেন্স এর যন্ত্রপাতি। কিন্তু নিরাপত্তার মানসিক স্বস্তি সেখানে নেই।

আমাদের বয়স যখন ৮/১০ তখন থেকেই কাছের শহীদ মিনারগুলোতে একা একাই যেতাম। রাতে অবশ্য আমরা ফুল চুরি করতাম, মুলত মহল্লার বিভিন্ন বাসা থেকে কিংবা সরকারি অফিস কমপ্লেক্স থেকে। এই চুরিতে কেউ কিছু মনে করতো না। শুধু যাদের গাছ, ডাল-পালা এবং অনেক সাধের ফুল সাবাড় করা হত তারা একটু কষ্ট পেত, আর সারারাত টেনশনে থাকতো তার বাগানে কি পরিমান ধ্বংস যজ্ঞ চলবে তা নিয়ে। পাশের বাসায় এক হিন্দু ভদ্রলোকের অনেক ফুল ছিল, উনি সারারাত টর্চ জ্বেলে বসে থাকতেন।

আরেকটি উপহার ছিল বই, সব সময় সস্তা। আগের দিনে লেখক মানেই গরীব, না খেতে পাওয়া, চোয়াল ভাংগা উদাস মানুষ। এখনকার ড্যান ব্রাউন সাহেবের মত ধনী লেখক ছিল না। শুনেছি উনার বছরে আয় ৬৫০ কোটি টাকা। তারপরেও উনার একটা বই বাচ্চাদের একটা খেলনার চেয়ে সস্তা।

উপহার হতে হবে স্বতঃস্ফুর্ত। ভালবাসা প্রণোদিত। বাধ্যতামূলক, সামাজিক, লোক দেখানো নয়। একবার আমার এক প্রিয় মানুষের বাসার কাছ দিয়ে যাচ্ছি, ভাবলাম অনেকদিন পর যাচ্ছি আবার কবে আসবো কে জানে একটু দেখা করে যাই। তিনি বেশ আপ্যায়ন করলেন এবং সাথে দুই কথা শুনিয়ে দিলেন হাতে করে কিছু নেইনি কেন। কোনো বাসায় গেলেই যদি কিছু নিয়ে যেতে হয় তাহলে হিসেব করে যেতে হয়। আমার সামর্থ্য আছে, মনও আছে। ঘনিষ্ট মানুষেরা জানে আমার সমস্যা দোকানে যাওয়া এবং কেনা নিয়ে। আমি দরদাম করতে হয় বলে ফিক্সড প্রাইস দোকান ছাড়া যাইনা। ঢাকায় এসব দোকান এখন অনেক হলেও আগের দিনে খুব কম ছিল। যখন দরদাম করে বিপুল পরিমান ঠকে আসতাম তখন মানসিক শান্তি বিঘ্নিত হত। এজন্য নয় যে আমার বেশি টাকা চলে গেল, একজন মানুষ প্রতারণা করছে এই অনভূতিই কষ্টের। একই কারণে আমি সরকারি অফিসেও যাইনা, বাবার বয়েসি লোকজন অবলীলায় ঘুষ চায়, এটা দেখলে মানুষ জাতির উপর বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়।

এখন অনলাইনে অনেক জিনিষ কিনি বলে আমার বাবা আমার উপর মহা খেপে আছেন, এটা আবার কি রকম শপিং? না দেখে, না বুঝে, দামও নিশ্চিত বেশি নেয়! দাম সম্পর্কে আমার নিজের একটা কৌশল খুব কাজে লাগে। এই আবিস্কারের পর থেকে কেনা কাটা নিয়ে আমার সুখ নিরংকুশ। কৌশলটি হলো পন্যের দাম কত এটা আমলে নিই না। এই পন্যটির জন্য আমি কত দাম দিতে চাই সেটা বিবেচনা করে আমি মূল্য নির্ধারণ করি, এবং ফলাফল খুবই আশাদায়ক। আমার মত ছাগল যারা আছেন এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে পারেন, ভাল ফল পাবেন। কেউ যখন কোন শপিং করে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করে এটার দাম কত বল দেখি? আমার উত্তর শুনে অনেকে অবাক হয়ে যায়, এত অনভিজ্ঞ একজন কিভাবে এত কাছাকাছি দাম বলে? তবে কাপড়ের দামের ক্ষেত্রে এখন একটু কঠিন হয়ে গেছে। এখন জিজ্ঞেস করতে হয় কোথা থেকে কিনেছেন?

সবাই দামী উপহার পছন্দ করে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু উপহার এর সংস্কৃতি হওয়া উচিত নির্মল। সেটা হতে গেলে সামগ্রিকে দেখতে হবে শুধু মাধ্যম হিসাবে। সামগ্রি কখনো আত্মার পরিমাপ হতে পারেনা। জানি এই পুজিবাদি, ভোগবাদী সমাজে এসব কথার কোন মানে নেই, তারপরও আমি আমার অবস্থান পরিস্কার করলাম।

উপহার যারা দেন আমি তাদের কথাই বলছি, যারা নেন তাদের কথা কম বলছি কারণ এটা গ্রহীতার মানসিকতার বিষয়, ভালবাসা পেয়েও যদি তার মূল্যায়ন করতে না পারেন তবে তার জন্য সমবেদনা। এ বিষয়ে অসাধারণ একটা উক্তি আছে।

“I know what I have given you…

I do not know what you have received.”

― Antonio Porchia

Advertisements

Human ‘Resource’ or ‘Capital’?

In 2005 Director General of Bangladesh Institute of Management asked us if they need to change the name of the course from PGDPM (Post Graduation Diploma in Personnel Management) to PGDHR (Post Graduation Management in Human Resources Management) mentioning that in his own opinion ‘academically there are no differences between the courses’. Since BIM is governed by Ministry of Industrial Affairs, the process is getting bureaucratic and hectic.

Our reply was unanimous: the change is badly required.

There are three major shifts from old to new concepts.

The term “personnel” was used when employees had been perceived just as another element of the production process i.e. machine, building, and land. Therefore, dubbing them as “human resources” had been a major shift in perspective, because with the term “human resource”, Humans come to the fore.

The development of capitalism always focuses on profit and tends to consider investment on the human resource as cost. In 80’s we have had some people cheering at the prospect of a huge surplus labor force that should result in multiplied profit with the advent of the computer. We used to hear theoretical buzzwords like ‘knowledge revolution’. Some leftists began to saw this surplus labor force as an opportunity for a socialist revolution!

We hear these days of robotics with the inherent myth of Robots replacing mortal labors in the production floors. Robots were envisioned as a new prospective force devoid of fatigue, stress, or boredom ensuring higher accuracy and skills. Owners need not pay them a monthly salary, increment, promotion, provident fund, gratuity, cars, vacation etc. No strike………all problems solved.

In the 90s we have seen the gradual introduction of computers in office management mostly as a replacement for typewriters. In the late 90s when computers began to be used as storage and recordkeeping they were making more burdens on people. The software was reactive; therefore we used to work first and then enter data into the computer to keep the record, sometime to analyze transactional reports. Gradually from 2000 on we could introduce proper integrated software that improved and modified the business process. Software became pro-active, we do things in the software and software gives output we need. Also, development of MIS started helping Management to know what is happening in his company; helped better decision making and forecast.

None of these developments could make human resources surplus. Instead what we got is a manpower equipped with IT knowledge; they use computers, software, MIS reports that ensure better management, efficiency, and efficacy. We have got human resources value increased. Disappointing the profit-makers, Man behind the Machine is now more skilled, more educated, literate and free.

“Free” is an important word when we evaluate human resource. As we know, in the history of slavery and feudal culture “Labor” was not free as it is today. Therefore, freedom of labor is related to the dignity of the human race.

Capitalist economy despite their gigantic efforts not to started understanding Human as not only an element of production but the most valuable resource that creates, builds, thinks and operates.

Labors are honored as the resource. This is how we perceive people, believe in human race, it’s a total philosophical shift towards humanity.

Unfortunately, some human resource specialists are trying to coin new terms e.g. “Human Capital Management” unaware of the original philosophy and perception behind it. They think that to an entrepreneur most important concern would be “Capital”, hence if they treat “Labor force” as Capital, labor will get importance, they will be nurtured, valued and respected. Mixing the concept of Human with money, land, and machinery these people again are trying to degrade humanity as a whole. It is not us to change or put on trial our dignity; it is the entrepreneur who needs to understand the importance of his own existence on earth.

The people who advocate for the term “Capital” says by definition, resources are finite. We can strip coal, gold and iron mines until the supply is exhausted. Capital can be infinite, as it can be used to produce more and more capital. The notion is very interesting and new. Let’s see form science point of view in “Brief History of Time”
Stephan Hawking tells us only “time” and “space” is infinite. Some theologies and science have problem even with that. Where sunlight is now known to be finite “Capital” is infinite (?) and with this argument, we are changing the definition of a discipline!

Rabindranath Tagore in Haimanti differentiated between “Shompod” and “Shompotti”, people who only understand profit would not understand the concept.

“Capital is capital – you spend something now, in hopes of getting a return on your investment later. Many companies have come to recognize their investment in human capital may be the most important investment they will ever make. When it comes to human capital, you are investing in people and the “return” you receive most likely is much more than financial gain. You may also gain knowledge, a larger group of contacts, more productivity, increased happiness and security.”…… A famous argument in favor of “Human Capital”.

Let’s focus on the last two lines of the above argument, the machine gives financial gain, money brings money, and those who love to call human resource a capital, are talking of gaining knowledge, happiness etc. I am not sure those should be a saleable product or no. On earth, no philosopher could ensure that money-capital brings knowledge and happiness because the richest country on earth is not the happiest.

In the course of historical paradigm the labor department became part of the administration, later became personnel department and now it stands as Human Resources Department. Let us not turn back by introducing new terms that degrade ‘Humanity’ again as a whole. If some entrepreneur does not understand the importance of his people, that is his problem. If he understands profit but ignores human as resources, in no time his profit will decline. Dissatisfied employees cannot contribute to earning profit.

“Human Resource” is purely a philosophical term and that is how we should perceive our workforce.

বিশ্বকাপ ফুটবল ১৯৯০

এক

চার বছর পরপর একবার বিশ্বকাপ ফুটবল হয়, আমাদের এমনি পোড়া কপাল এইচএসসি পরীক্ষা আর খেলা, একই সময় পড়ল। সারারাত খেলা দেখে সকালে পরীক্ষা দেয়া কঠিন হবে, সুতরাং আইন জারি হল “খেলা দেখা যাবে না”। আমাদের ব্যাচ এসএসসি পরীক্ষায় ভাল ফল করেনি, তাছাড়া দুষ্টের শিরমনি সুতরাং আমাদের কারণে সবার খেলা দেখা বন্ধ।

আমাদের ব্যাচের লোকজন প্রথমে খুব একটা পাত্তা দিলনা, এরকম গুরুত্বপূর্ণ একটা সময়ে খেলা না দেখাইতো ভাল! কেউ কেউ একটু খুন-খুন করে নিয়ে শেষ অব্দি মেনে নিল।

এর মধ্যে খবর এলো , আমাদের পরীক্ষার সেন্টার বাহিরে হবার সম্ভাবনা আছে। বাহিরের কলেজের শিক্ষকদের ধারণা ক্যাডেটরা তাদের নিজেদের কলেজে পরীক্ষা দেয়, ভেতরে বসে কি কি করে কে জানে! এসব কারণে এরা ভাল রেজাল্ট করে। তারা অনেকদিন থেকেই এই পরিবর্তন চাইছিল। আমরা সম্ভাব্য এই পরিবর্তনে মহাখুশি। আনন্দে পড়াশুনা ছেড়ে দিলাম। দুইদিন পর খবর এল নিরাপত্তার কারণে এটা করা যাচ্ছেনা। আমরা হতাশ হয়ে আবার পড়াশুনা শুরু করলাম। পরীক্ষার আর মাত্র দুইদিন বাকি।

বাহিরের কলেজের শিক্ষকগন ভাবতেও পারবেন না বাহিরে পরীক্ষা হলে ক্যাডেটরা কি পরিমান খুশি হবে। আমাদের পরীক্ষা হয় একটি অডিটোরিয়ামে। ৪০০ লোকের বসার মত পরিসরে মাত্র ৫০ জন পরীক্ষা দেয়। গ্রিল দিয়ে ঘেরা থাকে পুরো এরিয়া, বাথরুম তার ভেতরে। পরীক্ষা শুরুর আগে দেয়াল রং করা হয়, ডেস্ক ও চেয়ারে বার্নিশ দেয়া হয়। এক বেঞ্চে বসে দুজন পরীক্ষা দেব ভাবতেই বিস্ময় বোধ করলাম। আমাদের সর্বোচ্চ যা দরকার হত তা হল লিখতে লিখতে দুই একটা পয়েন্ট ভুলে যাওয়া, এর বেশি কিছু নয়। কিংবা অংকের রেজাল্ট মেলানো।

পরিক্ষার দিন প্রায়-নগ্ন করে চেক করে ঢোকানো হয় সেই অডিটোরিয়ামে। সামনে থাকেন তিনজন ইনভিজিলেটর, পেছনে দুজন। এর মধ্যে সরকারি আমলা আর নানা রকম টিমের আনাগোনাতো আছেই। মরার উপর খাঁড়ার ঘা প্রতিদ্বন্দ্বী কলেজ থেকে আসা একজন ইনভিজিলেটর, তাঁর যন্ত্রণায় টেঁকা দায়।

অপরাধী থাকলে পুলিশের অসীম ক্ষমতা, না থাকলে বেচারা ক্ষমতা দেখাবেন কিভাবে? সুতরাং হম্বিতম্বি সার। অনেকে এই পর্যন্ত শুনেই দুম করে বলে বসতে পারেন তাহলে আপনাদের নকল করার ইচ্ছে আছে, সুযোগ নেই! উত্তর “না”। এই রোমাঞ্চ শুধু বাহিরে যাবার জন্যে। যারা বন্দি থেকেছেন তারাই জানেন মুক্তির আনন্দ কিরকম দেখতে।

পড়াশুনার এইসব ক্ষতি নিয়ে আমরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনোনিবেশ করলাম।


দুই

খেলা শুরুর দিন খেলার সময় যতই কাছে আসতে লাগলো ততই আমাদের অস্থিরতা বাড়তে লাগল। বাহার আমাদের কলেজের ঘোষিত ম্যারাডোনা। সে হাউসে হাউসে পাক খেতে লাগল। একটু ব্যাখ্যা করা দরকার, বাহারের দুলাভাই ছিলেন ইকনমিক্সের শিক্ষক। কমেন্ট্রি করতে গিয়ে একদিন এই ঘোষনা দেন, যেহেতু বাহার অসাধারণ একজন খেলোয়াড় ওটা স্থায়ী হয়ে গেল।

আমাদের আরেকজন সেরা খেলোয়াড় ছিল বদরুল। আমাদেরই প্রিয় বন্ধু, বাহার শের-ই-বাংলা হাউসের আর ও সোহরাওয়ার্দী হাউসের। অতি ভাল ছেলে। শাদামাটা মাটির মানুষ ছিল বিধায় কখনই সামনে আসত না। গোল পোষ্টের কাছে পরাস্ত গোল কিপারের অসহায় মুখের সামনে বল পাস করে দিত আরেকজনে কাছে।

কলেজ জীবনের শেষ দুই খেলায় তাকে আমি লোভ দেখালাম যদি হ্যাট্রিক করতে পারে একটা চাবির রিং উপহার দেব। চাবির রিং খুবই পছন্দ করে সে। নিশ্চিত রিঙের জন্য নয়, পর পর দুই খেলায় দুইটি হ্যাট্রিক করেছিল সে। চাবির রিংটা আজো দেয়া হয়নি। এরপর আমরা কলেজ থেকে চলে আসি, সেরকম করে আর দেখা হয়নি। এখন সে বিদেশে থাকে, যোগাযোগ সামান্য, শুধু মেইলে।

পয়েন্টে আসি, ইতিমধ্যে একজন বলেছেন গল্প করতে গিয়ে আমি অন্য বিষয়ে প্রচুর কথা লিখি। বাহার মুখ চুন করে একতলা, দোতলা, তিনতলা করতে লাগল। ফয়েজ অতি ভাল ছাত্র, এসএসসি তে ষ্ট্যান্ড করেনি, এবার না করলে আমাদের মান থাকেনা। খেলা প্রিয় মানুষ সে, খেলা না দেখে থাকা সম্ভব কিনা এটা নিয়ে মনে হয় নিজেই গবেষণা করতে লাগল। বাকিদের অবস্থাও কমবেশি একই।

অন্য ক্লাসের ছাত্ররা মনে মনে গালি, আর মুখে অনুযোগ দিতে লাগল, যেন আমরা সেধে পরীক্ষার এই তারিখ ফেলেছি। কিন্তু খেলা দেখতে চাইলেইতো আর খেলা দেখা যায় না, তার জন্য টিভি নামক চারকোনা বস্তু লাগে! আমাদের তিনটি কমনরুম তালা মেরে রাখা হয়েছে।


তিন

প্রথম খেলার দিন কে কিভাবে কমনরুম খুলেছে মনে নেই, আমরা খেলা দেখতে পেরেছিলাম। পরেরদিন শিক্ষকরা আমাদের সাথে খেলা নিয়ে আলাপ করতে এসে দেখলেন আমরা সবই জানি। বুঝলেন আমরা খেলা দেখেছি। একটা মিটিং করলেন, সিদ্ধান্ত হল কমনরুম বন্ধ থাকবে, হাউস টিচারগন খেয়াল রাখবেন।

পরেরদিন কমনরুম বন্ধ থাকবে জেনে অনেকগুলো দরজার মধ্যে যেগুলো কখানোই খোলা হয় না তার একটি আমরা খুলে রাখলাম। হাউসের শিক্ষক আর সহকারীগণ সামনের দিকের সব দরজা ভালো করে লাগালেন, কিন্তু ঐ দরজাগুলোর কাছে গেলেন না। রাতে যথারীতি খেলা দেখা হল। সকালে আমাদের কথাবার্তা শুনে শিক্ষকদের মুখ লম্বা হয়ে গেল। অন্য ক্যাডেট-দের চোখে ইর্ষার কটাক্ষ।

দুই/চার দিন এভাবে চলার পর আমাদের আক্কাসআলী স্যার মাঠে নামলেন। আক্কাস স্যার আমাদের ক্লাসের ক্যাডেট রানার বাবা, অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দী হাউসের হাউস মাষ্টার । হাউস মাষ্টার-রা খুবই ক্ষমতাবান ব্যক্তি। আক্কাসআলী স্যার প্রবীন হওয়ায় তার ক্ষমতা আরো বেশি। উনি বাংলা ডিপার্টমেন্টের হেড, কলেজ পরিচালনা কমিটির সদস্য ইত্যাদি।

রানার বাবা হওয়ায় আমাদের অসুবিধা ছিল অনেক, উনাকে অনেক বেশি মেনে চলতে হত, আমাদের দিকে তাঁর দৃষ্টি ছিল কড়া, ভাল করতে হবে। শাসনের ব্যাপারে উনি ষোল আনা কড়া হলেও আমাদের কখনো কোন সুবিধা দেননি। উনার হয়তো মনে হত, আমাদের ব্যাচের জন্য কিছু করলে অন্যরা ভাববে উনার ছেলের জন্যই উনি এটা করছেন, সে কারণেই তাঁর সারা জীবনের সততার দেয়ালে উনি দাগ লাগতে দেননি। এদিকে বেচারা আমরা চ্যাপ্টা হয়ে গিয়েছি।

আক্কাস স্যার তাঁর স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে হম্বিতম্বি করে হাউস এ্যাসিসটেনন্ট-দের ডেকে নিয়ে বললেন ঠিকভাবে বন্ধ করলে কিভাবে ওরা খেলা দেখে? এ্যাসিসটেনন্ট-রা মাথা চুলকে হতাশ কন্ঠে বলে

-বিশ্বাস করেন স্যার বিষয়ডা আমাগো মাতায় ঢুকতাছে না।
-মাথায় ঢুকবে কি করে তোমাদের মাথায় গোবর
-স্যার ছাত্ররা মনে হয় যাদু জানে
-যাদু! দেখাচ্ছি সব ম্যাজিশিয়ানদের ……………………।।

সে তালা নিজে টেনে দেখলো। সামনের দরজা গুলোর লক দেখলো। পরেরদিন স্যারের মাথা খারাপ হবার যোগাড়। ক্যাডেট-রা খেলা দেখেছে! কিকরে সম্ভব?

আমরা সোহরাওয়ার্দী হাউসকে বেছে নেবার পেছনে একটা কারণ ছিল, গভীর রাতে খেলা হয়, শিক্ষক বা স্টাফরা হাউস পরিদর্শনে আসলে সংখ্যায় একদুজনের বেশি হবেন না, স্যারদের তিনতলা পর্যন্ত আসতে বেশ সময় লাগবে, পালানোর জন্য অনেকটা সময় হাতে পাওয়া যাবে।

সেদিন রাতে স্যার এসে সব দরজা চেক করলেন, আমাদের গোমড় ফাঁক হল। খুলে রাখা দরজা আবিস্কার করে আনন্দে এক চিৎকার দিয়ে সে জানান দিল, “যাদু, যাদু-টোনা, ম্যাজিক এই দেখ ম্যাজিক, সেই সাথে হাউস এ্যাসিস্টেন্টদের বকা ঝকা কেন তারা তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে না?

আমাদের মাথায় বজ্রপাত হবার যোগাড়, এখন কি হবে? গভির রাতে নানান ফন্দি করছি, এই সময় কে যেন একটা বাঁশের মাথায় একটা বাঁকা করা জিনিষ বানিয়ে নিয়ে এল। সেপ্টিপিনের মত একটা তামার তারকে বাঁকা করে মাথায় সুতা লাগিয়ে একটা হুকের মত করে জানালা খোলা হল, তারপর ঐ বাঁশের যন্তর ঢুকিয়ে সিটকিনি খোলা হল। আনন্দের সাথে খেলা দেখা চলতে লাগল।

আক্কাস স্যার সদর্পে ঘোষণা করেছেন তিনি ক্যাডেটদের তেলসমতি ধরে ফেলেছেন! আমরা আমাদের পরাজয় মেনে নিলে পরের খেলাগুলো নির্বিঘ্নে দেখতে পারি। কিন্তু পরাজয় মেনে নেই কি করে? শত হলেও আমরা বিসিসি ৭ম ব্যাচ! আমাদের কেউ কেউ বলা শুরু করল স্যার আপনি ওই গোলটা দেখেছেন? স্যার অমুক প্লেয়ারের ওই পাসটা ঠিক হলে এই গোলটা হত, তাই না স্যার? নিখুঁত এই বর্ণনা শুনে স্যারের ভ্রূ কোঁচকাল। তোমরা জানেল কি করে?


 

চার

ক্যাডেট কলেজের ছেলেরা সারা বছর একটা নিয়মে পড়াশুনা করে বলে, পরীক্ষার সময়টাতে খুব বেশী টেনশন করতে হয়না। আর পুরো সিলেবাস পড়া থাকে বিধায় প্রশ্ন কমন পড়বে কিনা এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। সুতরাং পরীক্ষা আমরা ভালোই দিচ্ছিলাম। ক্যাডেট কলেজে প্রচুর পরীক্ষা হয় বিধায় পরীক্ষা ভীতি বলে কোন ব্যপার থাকেনা।

একদিন একটা কান্ড হলো। আমাদের অডিটরিয়ামের পাশেই সুন্দর ফুলের বাগান। সেই বাগান থেকে পরীক্ষার হলে একটা বড় গুইসাপ ঢুকে গেল। বাংলা পরীক্ষা। আজকের দিনের মত অবজেক্টিভ ছিলনা তখন। বাংলা লিখতে লিখতে হাতে ফোস্কা পড়ে যেত। এদিকে ক্যাডেট-রা চিৎকার দিয়ে চেয়ারের উপর পা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। শিক্ষকদের মাথা খারাপ হবার যোগাড়।

খবর পেয়ে এডজুটেন্ট তার বাহিনী নিয়ে এলেন, হাউস মাষ্টারগন দৌড়ে এলেন। কিছুক্ষন পর আক্কাস স্যার টের পেলেন।

“এইচএসসি পরীক্ষার হলে শয়তানি! আজ বাংলা পরীক্ষার দিন সময় নষ্ট!” এক চিৎকার। আক্কাস স্যার প্রথম ব্যক্তি যিনি বুঝতে পেরেছেন আমরা ভয় পাইনি, দুষ্টামি করছি। অন্যসব শিক্ষকদের হুশ হয়েছে ততক্ষণে। তারা আহা, আহা আজকের দিন এইরকম শয়তানি করে? লিখ, লিখ, লিখা শুরু কর! বলে আফসোস করতে লাগলেন।

ইনভিজিলেটর সাহেব মুচকি হাসতে লাগলেন, বাছাধন কিভাবে লেখা শেষ করো দেখি। পরীক্ষা ভালো হল। সারা কলেজে আমাদের এই চরম বোকামীর খবর চাউর হল। দুপুরে, লাঞ্চ করতে ডাইনিং-এ গেছি। আক্কাস স্যার সেখানে উপস্থিত হয়ে বললেন, দেখেছ তোমরা এদের কান্ড! আমরা যখন বাংলা পরীক্ষা দিয়েছি, পরীক্ষার পর হাত থেকে কলম আর খুলতে পারিনা। দুজন টেনে সেই কলম খুলেছে, আর এরা!

উনি কিছুতেই বাংলার প্রতি আমাদের এই আমুদে হাল্কা মনোভাব সহ্য করতে পারছিলেন না। কেউ কেউ আবার বলা শুরু করলো তার পরীক্ষার সময় ডাইরিয়া হয়েছে, কারো জ্বর। এইসব কান্ডের মধ্যে আবার ফুটবল। শিক্ষকদের ঘুম হারাম। আক্কাস স্যারের বেশি, কারণ রানাও পরীক্ষা দিচ্ছে। যেভাবে হোক খেলা দেখা বন্ধ করতে হবে।


 

পাঁচ

শিক্ষকগণ মহা বিরক্ত হয়ে, টিভি নিয়ে হাউস মাষ্টারের রুমে তালা বন্ধ করলেন। এই রুমে একটাই দরজা। খুবই গুরুত্বপূর্ণ সব কাগজপত্র, হাউস ফান্ডের লকার এসব থাকে, সুতরাং সেভাবেই রাখা হয়। হাউস মাস্টার নিজে দাঁড়িয়ে থেকে জানালা দরজা লাগালেন। চাবি পকেটে পুরে বাড়ি চলে গেলেন। আমাদের মাথায় হাত।

রাত নয়টা পর্যন্ত ভালোই পড়াশুনা হল। সেদিন গুরুত্বপূর্ণ খেলা। ফয়েজ, শওকত, হায়দার-আমরা মিলে খেলা দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিভাবে তখনও জানিনা। ভয়ংকর সব আইডিয়া মাথায় এলো। ভোর রাতে খেলা। আমরা নয়টার দিকে মাঠে নামলাম। উপর তলার দুই হাউসে হাউস মাষ্টারের রুমে ব্যাংকের মত একটি লোহার পাত বসিয়ে তিনটি করে তালা মারা। সেগুলো খোলার চেষ্টা করলে ডাকাতির মামলায় পড়তে হবে। সুতরাং শরীয়তউল্লাহ হাউস-ই ভরসা। এটি আমাদের হাউস।

হায়দার আবিষ্কার করল এই তালা লাগানোর পর দুই কড়ার মাঝখান দিয়ে কিছুটা ফাঁক হয় যার মধ্যে কিছু একটা ঢোকান সম্ভব। আমাদের এইসব উদ্যেগ দেখে অন্য ব্যচের ছেলেরা নানান মন্তব্য করতে লাগল।

“আজকে আর আপনাদের জারিজুরি খাটবেনা, বাদ দেন” আজকে যদি খেলা দেখতে পারেন, সারা জীবন আপনাদের গুরু মেনে নেব…………………এই সব। তালাটা বেশ বড়, কড়াগুলো মোটা, আমরা সিনেমার মত তার ঢুকিয়ে তালা খোলার চেষ্টা করলাম, ঘর্মাক্ত, বিরক্ত এবং ত্যাক্ত হয়ে হতাশ হয়ে বসে থাকলাম কিছুক্ষণ। এই সময় শওকত বুদ্ধি বের করল, যদি কড়ার পেছনের নাট খোলা যায় তাহলে খেলা দেখা সম্ভব। নাট খোলার জন্য যন্ত্রপাতি দরকার। বাহারকে খবর দেয়া হল, ও এসে পানির পাম্প থেকে সব নিয়ে এল। দুলাভাইর দৌলতে ওকে সবাই চেনে। খুব বেগ পেতে হয়নি।

এখন সমস্যা হল ঐটুকু ফাঁক গলে হাত ঢুকবে কি করে? হায়দার ইট, কাঠের টুকরা এইসব এনে দরজার ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে ফাঁকা একটু বড় করল। তার মধ্যে দিয়ে কিভাবে যেন ফয়েজ, শওকত আর রইস হাত দিয়ে নাট খোলার চেষ্টা করতে লাগল। দীর্ঘ দুই ঘন্টা চেষ্টা করে নাট খোলা হল। ওদের হাতের অবস্থা যা হল তাতে পরীক্ষার কথা ভেবে চিন্তা হবার কথা।

টিভি বের করে নিয়ে গেলাম সোহরাওয়ার্দী হাউসে। দুটো কারণ এক, পালানোর সময় এবং দুই এন্টেনার তার। প্রস্তুতি শেষ হল। ভোর রাতে খেলা দেখে, রাতেই আবার টিভি হাউস রুমে রেখে লক করা হল। কিন্তু ভাল টাইট দেয়ে গেলনা।

মরার মত ঘন্টা দুই ঘুমিয়ে গেলাম পরীক্ষা দিতে। পরীক্ষার পর শুরু স্যারদের সাথে খেলা নিয়ে আলোচনা। সেদিন জুনিয়র টিচার ছিলেন ডিউটি মাস্টার তিনি বিস্ময়ে হতবাক, তো…ম…রা… আই মিন…তো…ম…রা কি করে জানলে এসব? ধরা পড়েছিলাম আরো কয়েকদিন পর। সেটা ঐ নাটের কারণে। কিন্তু সেটা যে আমরা করেছি তার কোন প্রমান ছিলনা।

মিস করি সেইসব দিন……………………………………………………………।

মাছ ধরা


  পর্ব -০১

এসএসসি-তে উঠার পর একটি ক্যাডেটের একটি শিং গজায়, আর এসএসসি পরীক্ষার সময় দুটো শিং এবং একটি লেজ। আমাদেরও গজালো, আমরা নিয়ম, কানুন, সভ্যতা সব ভুলে নৈরাজ্য-বাসী। শিক্ষকরা যারা নরম মনের মানুষ তাঁরা বলতেন, আহা! ছেলেগুলো বাবা-মা ছেড়ে এত কষ্টে পড়াশুনা করে একটু নিয়মের ব্যত্যয় হলে ক্ষতি কি? শিথিল নিয়ম আর ইচ্ছা মাফিক চলার মধ্যে পার্থক্য আছে।

ক্লাস সাসপেন্ড হয়েছে, আমরা হাউসে পড়াশুনা করি। পরীক্ষা যখন খুব কাছে আমাদের ৫জন ক্যাডেট জুতা ছাড়া লাঞ্চ করতে গিয়েছে। পৃথিবীর সব দুষ্ট মানুষ মৃত্যুর পর ক্যাডেট হয়ে জন্মায় – যারা এই ধারণা পোষণ করেন তাদের মধ্যে একজন সেদিন ডিউটি মাষ্টার । যথারীতি তাদেরকে ডাইনিং হলে ঢুকতে দেয়া হল না। ক্লাসের ইজ্জতের ফালুদা হয়ে গেল। এর আগে অন্য ব্যাচকে দেয়া হয়েছে, আমাদের কেন দেবে না? একটা মজার বুমেরাং হল, কলেজে ঢোকার পর প্রথম তিন মাসে ক্যাডেটদের বংশ পরিচয় ভুলিয়ে দেয়া হয় এবং এক ধরণের টিম বিল্ডিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কমন ইন্টারেস্টের জন্ম দেয়া হত। সম্ভবত আর্মি থেকে এই প্রক্রিয়ার জন্ম। কিন্তু একতার বেশির ভাগ ব্যবহার হত, কলেজের নিয়ম ভাঙ্গার জন্য। বাকিটা প্রশাসন ও অন্য ব্যচের সঙ্গে ঝামেলা করার জন্য। সুতরাং বলা যায় প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া খুব-ই সফল ছিল।

প্রতিবাদ হিসাবে আমরা সবাই এক সাথে ডিনারে এলে সেটা নিয়ে তুমুল ঝামেলা হয়েছিল। এসএসসি পরীক্ষার্থীরা এই সুযোগ নেয় কারণ তারা বিশ্বাস করে এরকম গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষার আগে অন্তত শারীরিক নির্যাতন করা হবে না। আমাদের সেই ধারণা মারাত্মক ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। পরেরদিন দুপুরে ঠিক করা হল, নিজেরাই রান্না করে খাওয়া হবে। আমাদের কাছে কোন আগুন নেই, যেভাবে সিগারেট আনা হত সেই প্রক্রিয়ায় কিছু দেশলাই আসত। হাড়ি পাতিল বলতে একটা হরলিকস এর খালি বোতল আর খাবার জন্য একটি গ্লাস এবং পানির বোতল। অনেকে লুকিয়ে বিস্কুটের টিন রাখত। এসব কথা না ভেবেই প্রথমে মাথায় এলো মাছ ধরতে হবে।

হাউসের পেছনে একটি উঁচু দেয়াল, তার উপর কাঁটাতার। ওপাশে একটি লেক।এই লেকে মাছ চাষ হয়। বছরে একদিন বড়শি দিয়ে মাছ ধরা প্রতিযোগিতা হয়। এবং সেদিন হাত দিয়ে ডাইনিং হলে খাবার অনুমতি দেয়া হয়। হাত দিয়ে খাবার যত মজা, নিয়ম ভাঙ্গার মজা তার দ্বিগুণ। এইসব দিন খাবারে শর্ট পরবেই। এক স্যার ছিলেন ডাল শর্ট পরলে ‘এই টেবিলে ভাত দাও ‘ বলতে বলতে ডাইনিং হল ত্যাগ করতেন। এছাড়াও মাঝে মাঝে মাছ ধরা হত এবং সেদিন হাত দিয়ে খেতে দেয়া হত।


পর্ব -০২

বললেই অত বড় লেকে মাছ ধরা যায় না। মাছ ধরতে হলে জাল লাগে। আমাদের না আছে জাল না আছে এই বিষয়ে কোন অভিজ্ঞতা। একজন প্রস্তাব করল মশারি দিয়ে ধরা যেতে পারে। যেই বলা সেই কাজ। আমরা ১৫/২০ জন মশারি নিয়ে তৈরি। একটি টীম আমাদের বড় দেয়াল এপার-ওপার করতে সাহায্য করবে। আরেকটি টিম শিক্ষক বা গার্ড দেখলে সতর্ক করবে। কাঁটা তাঁরের উপর কম্বল বিছিয়ে আমাদের পার হওয়ার ব্যবস্থা করা হল।

আমরা ওপারে গেলাম, গিয়ে দেখি চারদিক নিঝুম, কোথাও কোন গার্ড নেই। অবাক হলাম, সাধারণত এরকমটা হয়না। সম্ভবত তীব্র রোদ এড়াতে সবাই পালিয়ে বেঁচেছে, তাছাড়া কেউ এখানে মাছ ধরতে পারে চিন্তা এতদূর অগ্রসর হবার কথা নয়। নেমে গেলাম পানিতে। মশারি দিয়ে মাছ ধরা যাবে কিনা সন্দেহ ছিল। সন্দেহ ভুল প্রমাণিত হল। অথবা এই লেকের মাছগুলো মহাবোকা। তারা বছরে এক-দুই দিন ছাড়া নিরুপদ্রব জীবন যাপন করে। খাবার দেয়ার আনন্দময় সময়টুকু ছাড়া অন্য কোন উৎপাতও সইতে হয় না।

মাছ ধরা চলছে এমন সময় লাল গিয়াস এক চিৎকার দিয়ে পুকুরের ভিতর দিকে সাঁতার দিল। গিয়াস মশারি আনার সময় পায়নি সুতরাং হাত দিয়ে মাছ ধরছিল। সে যখন তার মাছ তুলেছে দেখা গেল একটি মাছরাঙ্গা সাপ। ছেড়ে দিয়ে গিয়াস দীঘির মাঝের দিকে সাঁতার দিল সাপও একই দিকে, শুরু হয়ে গেল হুলস্থুল। গার্ডরা টের পেয়েছে, তাঁরা বাঁশি দিতে দিতে দৌড়ে আসছে। আমরা এই ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। গিয়াসকে ফিরিয়ে কোন মতে দেয়াল টপকালাম। বাঁশির শব্দে পুরো কলেজ ছুটে আসছে মনে হল, আমরা দৌড়ে রুমে ঢুকলাম। এই ব্যপারটি আগেই প্ল্যান করা ছিল। আমরা রুমে ঢুকেই বালতিতে মাছগুলো রেখে উপরে মশারি দিয়ে দিলাম, তার উপর সাবান আর ডিটারজেন্ট কেইস।

এডজুটেন্ট আর আর্মির ৪/৫ জন স্টাফ এসে হাজির হলেন। আমার রুম প্রথমে, আমার হাফপ্যান্ট এবং টাওয়েল জড়ানো খালি গা দেখে জানতে চাইলেন কি করছি, বললাম স্যার গোসল করতে যাচ্ছি। অনেকেই গোসল করতে যাচ্ছে হাতে বালতি, খালি গা, টাওয়েল জাড়ানো। এটা গোসলের সময়, আর এই গেটআপ নিতান্তই স্বাভাবিক। কলেজে লুঙ্গি বা অন্য কোন ব্যক্তিগত পোশাক রাখার নিয়ম নেই।

সবগুলো রুম ঘুরলেন কিছু পেলেন না। আমার ধারণা উনারা কল্পনাও করতে পারেননি আমরা মাছ ধরেছি। এবার একে একে রুম চেক শুরু হল। আমার খাটের নিচে মাছ ভর্তি বালতি অন্যদের মত সরাতে পারিনি। কারণ আমার রুম প্রথমে, আর মাছ ধরার স্পট থেকে শেষে। আমার রুমে একজন স্টাফ ঢুকলেন, মাছগুলো এখনো জীবিত, নড়ে চড়ে উঠছে আর প্লাস্টিকের বালতিতে শব্দ হচ্ছে। রুমে কিছু পেলেন না। যখন বেড়িয়ে যাবেন মাছগুলো জোড়ে নড়ে উঠল। উনি বাইরে গিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ালেন, নিচু হয়ে খাটের নীচ দেখলেন। কিছু নেই।

এডজুটেন্ট ও স্টাফরা দাঁড়িয়ে কিছু আলোচনা করল, তাদের চোখে মুখে একধরণের বিস্ময় এবং হতাশা। আমার রুমমেট রেজওয়ান অসম সাহসী মানুষ বালতি নিয়ে ওদের পাশ দিয়ে গোসল করতে চলে গেল। সব যখন শান্ত। মাছ গুনে দেখলাম ২৪টা ছোট বা মাঝারি সাইজের রুইমাছ। এখন রান্না হবে কি করে? অনেক প্ল্যান হয় কিন্তু কাজ হয়না।


পর্ব-০৩

আমাদের হাউস থেকে কিছু দূরে একটি পানির পাম্প আছে যেখান থেকে পুরো কলেজে পানি সাপ্লাই দেয়া হয়। বিরাট উঁচু পানির ট্যাংকের নিচে একতলা ঘর। বাহারের দুলাভাই কলেজের একজন শিক্ষক সেই সূত্রে সে জানে ওখানে গেলে রান্না-বান্নার ব্যবস্থা হতে পারে। একজন তিন চারটা শার্ট নিলো, ওখানে আমাদের কাপড় আয়রণ করা হয়, আমাদের ওদিকে যাওয়া নিষেধ। কাপড় নিয়ে ধরা পড়লে সমস্যা হবে তবে সেটা খুব বড় হবার কথা নয়। দুজন গেল। তারা মাছ দেখে প্রলুব্ধ হল। ঠিক হল ২০০ টাকা আর ৪ টা রুই মাছ দিতে হবে তাদের। ভাতের চাল, মশলা সব আমাদের জোগাড় করতে হবে। মহাবিপদ।

বিকালের শিফটে ডাইনিং এর কর্মচারীরা ডিউটি-তে যাচ্ছেন, ডাইনিং হল আর ওদের থাকার কলনি হাউসের দুই দিকে, সুতরাং বেআইনি ভাবে ওরা আমাদের হাউসের পেছনদিয়ে যাতায়াত করে। তানা হলে বড্ড দূর হয়। সাইকেল না থাকলে এতদূর হাঁটা কষ্টের ব্যাপার। আমাদের হাউস নিচতলায়। রুমের পিছন দিকে মস্ত জানালা। অপেক্ষার পালা শেষ করে তাঁরা এলেন, একজনকে চালের ব্যাপারটা গছানো গেল। বিনিময়ে ২টা রুই। এভাবে রাতে যখন খেতে বসেছি তখন আমাদের পাতে পড়ল ১১টা রুই, বাকি সব ঘুষ।

জানালায় কম্বল দেয়া হয়েছে। মাটিতে বিছানা। রাত দশটায় লাইটস অফ হয়ে যায়। তাই রাতে আলো জ্বালাতে হলে জানালায় কম্বল দেয়া হত। কাজটি করা হত খুব নিখুঁত ভাবে। তারপরও আমরা অতিরিক্ত সতর্কতা হিসাবে মোমবাতি জ্বালালাম। খেতে কেমন হয়েছিল নিজেরাই ভেবে দেখেন, এটাও আমাকে বলতে হবে? মাছ ধরতে ধরতে ক্লান্ত হয়ে গেছি।


 

%d bloggers like this: