সুমেরিয়ান মিথ অনুযায়ী মানুষ সৃষ্টির রহস্য।

সুমেরিয়ান ট্যাবলেটের অনুবাদ  থেকে যেসব তথ্য পাওয়া যায় তার ভেতর একটি হলো সৃষ্টি তত্ব। খুব বিস্ময়কর হলেও সত্য যে এই তত্বের সাথে জেনেসিস এবং বাইবেলে প্রাপ্ত তত্বের সাথে ঘনিষ্ট মিল খুজে পাওয়া যায়। সুমেরিয়ান সৃষ্টি রহস্যকে দুইভাগে ভাগ করা যায়।

একঃ পৃথিবী সৃষ্টির রহস্য।

দুইঃ মানুষ সৃষ্টির রহস্য।

সুমেরিয়ান ট্যাবলেট অনু্যায়ী ‘আনুনাকি’ শব্দের মানে “আকাশ থেকে আগত”। এই এইলিয়েনরা নিবিরু নামের একটি গ্রহ থেকে পৃথিবীতে আসে স্বর্ণ সংগ্রহের জন্য। নিবিরু’র জলবায়ুতে কিছু সমস্যা দেখা দিলে গ্রহটি ক্রমশ বসবাস করার অনুপযোগী হয়ে পড়ছিল। গ্রহকে বসবাস উপযোগী রাখার জন্য তাদের প্রচুর স্বর্ণের প্রয়োজন দেখা দেয়। সুমেরিয়ান ট্যাবলেটের লেখায় পাওয়া যায় ভিনগ্রহ থেকে আগত এই মহাকাশচারীগন মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে স্বর্ণের সন্ধান পায় এবং স্পেসপোর্ট, মিশন পরিচালনা কেন্দ্র এবং ইরিদু নামে একটি শহর সেখানে প্রতিষ্ঠা করে। আনুনাকিদের রাজা লর্ড আনু’র নির্দেশে পরে তারা মংগলগ্রহে একটি রিলে সেন্টার এবং চাঁদেও নানা স্থাপনা তৈরী করে।

আনুনাকি মহাকাশচারীরা সোনার খনিতে কাজ করতে করতে একটি পর্যায়ে কায়িক শ্রমে বিরক্ত হয়ে বিদ্রোহ করে বসে এবং কাজকর্ম বন্ধ করে দেয়। লর্ড আনু এবং তার দুই ছেলে এনলিল (Enlil) এবং এনকি (Enki) পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেন তারা একটি দাস শ্রেণী তৈরী করবেন, যারা শারীরিক শ্রমের কাজকর্মগুলো করবে এবং অন্যান্য কাজ যেমন নিরাপত্তা প্রদান করবে। এনকি (Enki) ছিলেন পৃথিবী গ্রহের দায়িত্বপ্রাপ্ত। তিনি ছিলেন মহাজ্ঞানী দার্শনিক এবং বিজ্ঞানী। তার উপর দায়িত্ব দেয়া হয় এই দাস সৃষ্টি করার। এনলিল (Enlil) শুরু থেকেই এর তীব্র প্রতিবাদ করতে শুরু করলে বিষয়টি আনু’র গোচরে আনা হয়। আনু তার কাউন্সিলের সাথে আলাপ করে দাস তৈরীর সিদ্ধান্ত নেন, কারণ নিবিরুকে বাঁচানোর আর কোন পথ নেই। গর্ভধারণ ও জন্মদানের দেবী নিনমাহকে মা-দেবীও বলা হয়। তিনি শুরু থেকেই মানব জন্মের পক্ষে ছিলেন, এমনকি তিনি দাস না বলে এই নতুন সৃষ্টিকে সহকারী বলার পক্ষপাতি ছিলেন। আনু’র কাছ থেকে অনুমতি পাওয়ার পর এনকি (Enki) মানুষ সৃষ্টিতে নিনমাহ’র সাহায্য নিয়ে কাজ শুরু করেন।

প্রথমদিকে পৃথিবীর মানুষের কাছাকাছি একটি প্রানীর ডিম্বানু এবং আনুনাকি শুক্রাণুকে টেষ্টটিউব পদ্ধতীতে নিশিক্ত করে পৃথিবীর ঐ মানুষ সদৃশ প্রানীর গর্ভে স্থাপন করা হয়। কিন্তু এই পদ্ধতীতে বার বার বিকৃতি আসতে থাকে। আনুনাকি-রা জিন (Gene) পরিবর্তন করার কৌশল জানতো। যদিও প্রথম দিকের মানুষের কাছাকাছি প্রানীরা গায়ে গতরে অনেক বড় এবং শক্তিশালী ছিল কিন্তু তাদের বুদ্ধিবৃত্তি ছিল খুব নিম্নস্তরের। এই নিম্ন স্তরের প্রানীদের দিয়ে উন্নত কাজ যেমন পশুপালন, কৃষি উৎপাদন এবং নতুন পণ্য তৈরীর কাজ করা সম্ভব ছিল না। তাছাড়া তারা অনেক ক্ষেত্রে কানে শুনতো না বা কথা বলতে পারতো না। আনুনাকিদের এমন এক শ্রেনীর দাস প্রয়োজন ছিল যারা ভাবের বিনিময় করতে পারে, নির্দেশ গ্রহণ করতে পারে এবং শৃংখলা বজায় রাখতে পারে।

এনকি (Enki) ছয়বারের চেষ্টায় মানুষের সাথে আনুনাকি-দের ডিএনএ এর সফল মিক্সিং করেন। বলা হয় ৮০% প্রাক্তন মানুষ সদৃশ প্রানির ডিএনএ এবং ২০% আনুনাকি ডিএনএ এর শংকর করে তিনি সফল হন এবং প্রথম মানুষ (Homosapience) আদামু-কে সৃষ্টি করেন। সে হিসেবে আদামু ছিল প্রথম পরিপূর্ণ মানুষ।

আদামু-কে তৈরী করতে এনকি (Enki) ক্রিস্টালের টেষ্ট টিউব পরিবর্তণ করে মাটির তৈরী টেষ্টটিউব ব্যবহার করেন এবং আনুনাকি গর্ভে ৯ মাস রাখার সিদ্ধান্ত নেন। নিনমাহ স্বেচ্ছায় একাজে সম্মত হন এবং নয় মাস তাকে গর্ভে ধারন করেন। ৯ মাস পর বাচ্চা প্রসব করলে এনকি (Enki) উচ্ছসিত হয়ে পড়েন এবং বলেন আমার নিজের হাতে তৈরী। সম্পুর্ন আনুনাকিদের মত দেখতে একটি পুরুষ শিশুকে সৃষ্টি করতে পেরে এনকি এবং নিন্মাহ খুব-ই খুশী হন। পার্থক্য একটি-ই লিঙ্গের মাথায় একটু চামড়া ঝুলছিলো যেটা আনুনাকি-দের মত নয়। নিনমাহ মাটি থেকে তৈরী বলে তার নাম দেন আদামু।

এই সৃষ্টিকে সার্থক করার জন্য মাটি ছাড়াও আনুনাকি ডি এন এ প্রয়োজন হয়, সেকারণে একজন ইগিগি (আনুনাকি পাইলট) কে হত্যা করে তার জমাট রক্ত ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বার বার দাস তৈরী করতে আনুনাকি গর্ভ ব্যবহার করতে হবে এটি অবাস্তব মনে হলে এনকি (Enki) ও নিনমাহ প্রথম নারী মানুষ তৈরী করার সিদ্ধান্ত নেয়। এবারে অবশ্য ডিএনএ/জিন এর জন্য আদামু’র লিংগের চামড়া কেটে সেই রক্ত ব্যবহার করা হয়। এনকি (Enki) তার স্ত্রী’র কাছে প্রস্তাব রাখেন মেয়ে বাচ্চাটি গর্ভে ধারন করবার জন্য। নয় মাস পর সুন্দর ফুটফুটে একটি মেয়ে বাচ্চা জান্মালে তার নাম রাখা হয় তিয়ামাত।

তিয়ামাত শব্দের অর্থ “Mother of life” বা জীবনদায়িনী। ইংরেজীতে যা ইভ  এবং হিব্রুতে “হাওয়া”। এভাবে অন্য আনুনাকিদের গর্ভে আরো সাতটি মেয়ে বাচ্চা জন্ম দেয়া হয়। আদামু এবং তিয়ামাত প্রথম পরিপূর্ণ মানুষ এই বিবেচনায় তাদেরকে ইরিদু রাজ্যের ‘দ্য সিটি অব এনকি’তে ইডেন নামক স্থানে রাখার সিদ্ধান্ত হয়। সেখানে তাদের জন্য ঘর এবং বাগান তৈরি করা হয়।

ইডেন শব্দের অর্থ সমতল্ভূমি। এই শব্দটি প্রথম লিখিত হয় সুমেরিয়ান ‘গিলগামেশ উপকথায়’।  ‘গার্ডেন অব ইডেন’ বলতে এখানে ‘দেবতাদের বাগান’ বোঝানো হয়েছে। এই বাগানটির সঠিক অবস্থান কোথায় তা বলা না থাকলেও সেটি টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিস নদীর মাঝে গড়ে ওঠা সমতলে অবস্থিত বলে উল্লেখ আছে।

এতকিছুর পর সবাইকে হতাশ করে দিয়ে নতুন জন্মানো নর-নারী-রা গর্ভধারণ এবং বাচ্চা জন্মদানে ব্যর্থ হয়। এনকি এবং নিন্মাহ “হাউস অব হিলিং”-এ (সম্ভবত আজকের দিনের হাসপাতাল) এই সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ করতে শুরু করে। তারা মানব দেহে প্রাণ এবং তার বংশগতি নিয়ে গবেষনা করে দেখতে পান দ্য ট্রি অব লাইফ’ (প্রাণবৃক্ষ) এ মোট ২২ টি শাখা রয়েছে। কিন্তু আনুনাকিদের এই ২২ জোড়া’র পরও আরও এক জোড়া শাখা রয়েছে, আদামু বা তিয়ামতের যা নেই। ঘর থেকে সবাইকে বের করে দিয়ে, দরজা বন্ধ করে তারা এবিষয়ে পরামর্শ করেন এবং এনকি’র পাজরের হাড় থেকে প্রানারস নিয়ে আদামু’র পাজরে স্থাপন করেন। অন্যদিকে নিনমাহ-এর পাঁজর এর হাড় থেকে প্রানরস নিয়ে তিয়ামাত এর পাজরে স্থাপন করা হয়। দুজনের “ট্রি অব লাইফে” এভাবেই দুই জোড়া নতুন শাখা বা ক্রোমসোম সংযুক্ত করা হয়। মানুষের মোট ক্রমসোম সংখ্যা দাঁড়ায় ২৩ জোড়া।

কিন্তু এই পরিবর্তনের ফলে আদামু এবং তিয়ামাত তাদের লজ্জা স্থান সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠেন। তিয়ামাত গাছের পাতা দিয়ে তার লজ্জাস্থান ঢাকার ব্যবস্থা করেন। একদিন এনলিল প্রচন্ড গরমে বাগানে ঘুরতে আসলে আদামু এবং তিয়ামাত-কে গাছের পাতা দিয়ে লজ্জাস্থান ঢাকা্রত দেখে বিস্মিত হন। তিনি এনকি’র কাছে এর ব্যাখ্যা চাইলে এনকি তার এক্সপেরিমেন্ট এবং মানুষের সন্তান জন্মদানের অক্ষমতা এবং নতুন ক্রমোজম সংযোজনের কথা তাকে জানান।

এনলিল এটা শুনে রাগে ফেটে পড়েন এবং আদামু ও তিয়ামাতকে গার্ডেন অব ইডেন থেকে বের করে দিয়ে খনি শ্রমিক হিসাবে নিয়োগদান করার নির্দেশ দেন।


১/ সুমেরিয়-সভ্যতা।

2/ সুমেরিয়ান ট্যাবলেটঃ যেভাবে চিনি এই সভ্যতাকে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s