সুমেরিয় সভ্যতা।

পৃথিবীর সবচেয়ে পুরানো দিনগুলিতে আমরা কোন প্রশ্নের উত্তর খুঁজি না। আমরা খুঁজি বর্তমানে কারন বর্তমান মানেই আধুনিক, বৈজ্ঞানিক এবং সামনের। অতীত আমাদের সামনে ধোঁয়ার মত, পচা, গলা, অবৈজ্ঞানিক, অশিক্ষা, বন-জংগল, গুহা-মানব। আগের দিনের রাজা বাদশাদের বিরাট ইমারতগুলো আমাদের শুধু নিকট ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয় গৌতম বুদ্ধের ‘অনিচ্য’ বা নশ্বরতা’র কথা। এছাড়া এগুলো থেকে আমাদের গ্রহন করার কিছু নেই। বাড়ির পাশে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কেমন লোক ছিলেন আমরা নিশ্চিত জানিনা। হিন্দুদের ইতিহাসে একরকম লেখা, মুসলমান লেখকদের আরেক রকম আবার বৃটিশ বেণিয়া লিখেছে আরেকভাবে।

‘পৃথিবীর ইতিহাস রচনা করেছে বিজয়ীরা, কিন্তু ইতিহাসের আড়ালেও একটি ইতিহাস থাকে, সেটি সত্যিকারের গণমানুষের ইতিহাস” ইতিহাসের  বইয়ে চোখ রাখলে সেখানে শুধু যুদ্ধ আর যুদ্ধ। যে পরাজিত তার লেখার সুযোগ কোথায়? সুতরং যিনি জিতে গেলেন তিনি এক গন্ডা ভাড়াটে লেখককে দিয়ে নিজের বিজয়ের মহিমা লিখিয়ে নেবেন এটাই সংগত। ভাগ্যক্রমে যদি  এই লেখা পরবর্তি কোন বংশ বা আগ্রাসী রাজার হাত থেকে বেঁচে যায় আমরা পাই এক বিজয়ী রাজার এক পাক্ষিক জয়ের গল্প। আর যদি এগুলো পরবর্তি বিজয়ীদের হাতে আসে, তাহলে আবার বিকৃত হয়, হতেই থাকে।

তাই আজকের ইতিহাস ঠাকুর মা’র ঝুলি ছাড়া কিছু নয়। কার্ল মার্ক্স তাই ইতিহাস পড়ার একটি নিয়ম শিখিয়ে দিয়েছেন, ‘ঐতিহাসিক ভাবে আমরা যদি কট্টর দৃষ্টি গ্রহণ করতে পারি, সত্যের কিছুটা কাছাকাছি যেতে পারি’। বলা হয় আমরা যে ইতিহাস জানি সেটা ভুল ইতিহাস। বলা হয় মানুষের আসল ইতিহাস লুকিয়ে রাখা হয়েছে মানুষের কাছ থেকেই, এবং এই কাজও কিছু মানুষেরই। কি কারনে বলা মুশকিল তবে ঠিক এরকমটি হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে পুরাতন সভ্যতা ‘সুমের’ সম্পর্কে। পৃথিবীতে এর চেয়ে পুরানো সভ্যতা থাকলেও থাকতে পারে কিন্তু তার প্রমাণ অটুট নেই, যেরকমটি আছে ‘সুমের’ সম্পর্কে।

প্রাচীন মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে প্রথম সুমেরিয়ান সভ্যতার সুচনা ও বিকাশ ঘটে। সহজ করে বললে আজকের ইরাক এবং তার আসে পাশের কিছু অঞ্চল যেমন সিরিয়া ও তুরস্কের কিছু এলাকা নিয়ে এই মেসোপটেমিয়া। টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিস নদীর মাঝে গড়ে ওঠা দ্বীপটিতে সভ্যতার প্রথম প্রদীপটি জ্বলে ওঠার কারণ নিয়ে অনেক মতভেদ আছে, কিন্তু উঠেছিল যে সে সম্পর্কে কোন দ্বিমত হবার সুযোগ এখন আর নেই। 

খ্রিস্টপূর্ব ১০০০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ সালে এই সভ্যতার বিকাশ ঘটে বলে প্রমান পাওয়া গেছে। তার মানে ছয় থেকে বারো হাজার বছর আগে আমাদের এই পৃথিবীতে একটি উন্নত সভ্যতার বিকাশ ঘটে। কিন্তু মানুষ যখন গুহায় বাস করে, কৃষিকাজও শেখেনি সেই তখন আধুনিক এই সভ্যতা কি করে গড়লো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে নানা জটিলতা তৈরী হয়। তাই আমাদের অতি ক্ষমতাশীল সরকার ব্যবস্থা, মুলত যারা এই গ্রহ পরিচালনা করেন তারা সিদ্ধান্ত নিলেন এসব আমাদের (আমজনতার) না জানাই ভাল। কার ভালো তা কেউ জানেনা তবে পরিচালকদের জন্য ভাল এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।

বিগত ১৫০ বছরে ফ্রেঞ্চ এবং বৃটিশ আরিকিউলজিস্ট রা খুজে বের করেন উন্নত এই সভ্যতাকে। মানুষ বিস্ময়ের সাথে জানতে পারে সভ্যতার শুরুর ব্যখ্যাহীন ইতিহাসের কথা। এই প্রথম মানুষের কাছে মিশরের পিরামিড, মহেঞ্জেদারো, হরোপ্পা, গ্রিক দেব দেবী, হিন্দু দেব দেবী, ব্যবিলন এবং রোমের গড দের জন্ম এবং জ্বীন, দাজ্জাল সহ সকল ধর্মের রহস্য উন্মোচিত হতে শুরু করে একের পর এক।

যেরকম ভাবা হত সভ্যতার জন্ম গ্রিস থেকে, তা নয়, তার চেয়েও উন্নত সভ্যতার অস্তিত্ব পৃথিবীতে ছিল এটি জানার পর চমকে যায় পৃথিবী। টাইগ্রিস এবং ইউফ্রটিস নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সুমেরিয় সভ্যতায় প্রথম কৃষি কাজের সূচনা ঘটে। এই নদী দুটি যেমন পরিবহন সুবিধা দিয়েছে, তেমনি দিয়েছে মৎস্য আহরণ কেন্দ্রিক অর্থনীতি। সাত-আল-আরাব অঞ্চলের সমতলে এই জীবন যাত্রা গড়ে উঠলে দেখা যায় তারা পরবর্তী কালের কৃষি নির্ভর এলাকার মত প্রকৃতি নির্ভর নয়। তারা পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাবিত করবার মত জ্ঞান এবং সামর্থ্য রাখতো।

বিকেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থা ও সেবা, নগর পরিকল্পনা, লেখনী ও লিপি, ধর্মচর্চা, ব্যবসা-কেন্দ্র, বাণিজ্য পথ, বাড়ি এবং ভবন নির্মান সহ সকল প্রকার আধুনিক ব্যবস্থার সূচনা ও প্রসার হয়েছিল এখান থেকে। সুমেরিয়ান-রা এতটা উন্নত ছিল যে নদীতে বাধ নির্মাণ করে পানিকে ইচ্ছে মত প্রবাহিত করার প্রযুক্তি ও জ্ঞান তাদের ছিল। ঘরকে ঠান্ডা রাখার, বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা সহ নগর সৌন্দর্যের প্রতিও তারা যত্নশীল ছিল। মেয়েরা সোনা রূপা সহ অনেক ধরনের অলংকার পড়তো সে সময়, সে সব ডিজাইন এবং নান্দনিকতায় উন্নত ছিল।  

সুমেরিয়ানদের লিখিত এবং অলিখিত আইন কানুন ছিল এবং একে অপেরর সাথে লিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ হতো। বিংশ শতাব্দির শুরুর দিকে পারস্যের শহর সুসা’য় নৃতত্তবিদ্গন ব্যবিলনের রাজা হামুরাবি’র পাথরটি আবিস্কার করার পর দেখা গেল সকল প্রকার আইন কানুন এবং নীতিমালা এই পাথরটিতে খোদাই করা রয়েছে। ২৮২ টি অনুচ্ছেদে ভাগ করা এই আইন শীলাটি খ্রিশটপুর্ব ১৬৯৪ দশকের বলে ধারনা করা হয়। আইনে বিবাহ, বানিজ্য, সম্পদের উত্তরাধিকার থেকে শুরু করে সব ধরনের দৈনন্দিন বিষয় স্থান পেয়েছে। যেমন অনুচ্ছেদ ১৯৬ তে বলা আছে ‘চোখের বদলে চোখ’, পরবর্তিতে নবী মুসা’র সময় এই আইন দেখা যায় এবং অনেকের কাছেই এই আইন এখনও পরিচিত হবার কথা। সুমেরিয়ান সভ্যতার প্রধান শহর ছিল ৪টি গিরসু, নিপার, উরুক এবং অর।

2/ সুমেরিয়ান ট্যাবলেটঃ যেভাবে চিনি এই সভ্যতাকে।

 

Advertisements

3 thoughts on “সুমেরিয় সভ্যতা।

  1. জানি না says:

    লিখা টা কি এখানেই শেষ না কি আরো কিছু জানতে পারবো…..

    Like

      • জানি না says:

        বিষয়টা খুব অন্যরকম কিন্ত পরে খুব ভালো লেগেছে ….. ইতিহাস যারা লিখেছেন ( যদিও আমার ইতিহাসের জ্ঞান খুবই কম …. বলা চলে ssc level পর্যন্তই সীমাবদ্ধ …. কারন ssc তেই compulsory subject হিসাবে পরতে হয়েছে …. এই subject এ কখনই কোনো interest পাই নি ….. তাই পরি ও নি এর বেশী ….. বরং civics পরবরতি তে political science or even sociology র মধ্যে যতটুকু ইতিহাস রিলেটিভলি এসেছে সেগুলো সবসময়ই পরতে ভালো লেগেছে )…. তারা সব সময় চেষ্টা করেছেন কিভাবে যুদ্ধে জয় পরাজয় হলো সেগুলোর কাহীনি জানাতে ….. ssc তে এর বাইরে কিছুই ছিল না …. higher studies এ general history হয়তো অন্য রকম …. যা আমি ঠিক জানি না …..
        যদিও তোমার লিখাটা শেষ হয় নি তার আগে সেরকম মন্তব্য করা হয়তো ঠিক হবে না … তারপরে ও বলছি লিখাটার মধ্যে ইতিহাস, সমাজ বিজ্ঞান রাষ্ট্রনীতি আর কিছুটা আইন শাস্ত্র খুঁজে পাচ্ছি ……

        Keep going !

        Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s