মাছ ধরা


  পর্ব -০১

এসএসসি-তে উঠার পর একটি ক্যাডেটের একটি শিং গজায়, আর এসএসসি পরীক্ষার সময় দুটো শিং এবং একটি লেজ। আমাদেরও গজালো, আমরা নিয়ম, কানুন, সভ্যতা সব ভুলে নৈরাজ্য-বাসী। শিক্ষকরা যারা নরম মনের মানুষ তাঁরা বলতেন, আহা! ছেলেগুলো বাবা-মা ছেড়ে এত কষ্টে পড়াশুনা করে একটু নিয়মের ব্যত্যয় হলে ক্ষতি কি? শিথিল নিয়ম আর ইচ্ছা মাফিক চলার মধ্যে পার্থক্য আছে।

ক্লাস সাসপেন্ড হয়েছে, আমরা হাউসে পড়াশুনা করি। পরীক্ষা যখন খুব কাছে আমাদের ৫জন ক্যাডেট জুতা ছাড়া লাঞ্চ করতে গিয়েছে। পৃথিবীর সব দুষ্ট মানুষ মৃত্যুর পর ক্যাডেট হয়ে জন্মায় – যারা এই ধারণা পোষণ করেন তাদের মধ্যে একজন সেদিন ডিউটি মাষ্টার । যথারীতি তাদেরকে ডাইনিং হলে ঢুকতে দেয়া হল না। ক্লাসের ইজ্জতের ফালুদা হয়ে গেল। এর আগে অন্য ব্যাচকে দেয়া হয়েছে, আমাদের কেন দেবে না? একটা মজার বুমেরাং হল, কলেজে ঢোকার পর প্রথম তিন মাসে ক্যাডেটদের বংশ পরিচয় ভুলিয়ে দেয়া হয় এবং এক ধরণের টিম বিল্ডিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কমন ইন্টারেস্টের জন্ম দেয়া হত। সম্ভবত আর্মি থেকে এই প্রক্রিয়ার জন্ম। কিন্তু একতার বেশির ভাগ ব্যবহার হত, কলেজের নিয়ম ভাঙ্গার জন্য। বাকিটা প্রশাসন ও অন্য ব্যচের সঙ্গে ঝামেলা করার জন্য। সুতরাং বলা যায় প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া খুব-ই সফল ছিল।

প্রতিবাদ হিসাবে আমরা সবাই এক সাথে ডিনারে এলে সেটা নিয়ে তুমুল ঝামেলা হয়েছিল। এসএসসি পরীক্ষার্থীরা এই সুযোগ নেয় কারণ তারা বিশ্বাস করে এরকম গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষার আগে অন্তত শারীরিক নির্যাতন করা হবে না। আমাদের সেই ধারণা মারাত্মক ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। পরেরদিন দুপুরে ঠিক করা হল, নিজেরাই রান্না করে খাওয়া হবে। আমাদের কাছে কোন আগুন নেই, যেভাবে সিগারেট আনা হত সেই প্রক্রিয়ায় কিছু দেশলাই আসত। হাড়ি পাতিল বলতে একটা হরলিকস এর খালি বোতল আর খাবার জন্য একটি গ্লাস এবং পানির বোতল। অনেকে লুকিয়ে বিস্কুটের টিন রাখত। এসব কথা না ভেবেই প্রথমে মাথায় এলো মাছ ধরতে হবে।

হাউসের পেছনে একটি উঁচু দেয়াল, তার উপর কাঁটাতার। ওপাশে একটি লেক।এই লেকে মাছ চাষ হয়। বছরে একদিন বড়শি দিয়ে মাছ ধরা প্রতিযোগিতা হয়। এবং সেদিন হাত দিয়ে ডাইনিং হলে খাবার অনুমতি দেয়া হয়। হাত দিয়ে খাবার যত মজা, নিয়ম ভাঙ্গার মজা তার দ্বিগুণ। এইসব দিন খাবারে শর্ট পরবেই। এক স্যার ছিলেন ডাল শর্ট পরলে ‘এই টেবিলে ভাত দাও ‘ বলতে বলতে ডাইনিং হল ত্যাগ করতেন। এছাড়াও মাঝে মাঝে মাছ ধরা হত এবং সেদিন হাত দিয়ে খেতে দেয়া হত।


পর্ব -০২

বললেই অত বড় লেকে মাছ ধরা যায় না। মাছ ধরতে হলে জাল লাগে। আমাদের না আছে জাল না আছে এই বিষয়ে কোন অভিজ্ঞতা। একজন প্রস্তাব করল মশারি দিয়ে ধরা যেতে পারে। যেই বলা সেই কাজ। আমরা ১৫/২০ জন মশারি নিয়ে তৈরি। একটি টীম আমাদের বড় দেয়াল এপার-ওপার করতে সাহায্য করবে। আরেকটি টিম শিক্ষক বা গার্ড দেখলে সতর্ক করবে। কাঁটা তাঁরের উপর কম্বল বিছিয়ে আমাদের পার হওয়ার ব্যবস্থা করা হল।

আমরা ওপারে গেলাম, গিয়ে দেখি চারদিক নিঝুম, কোথাও কোন গার্ড নেই। অবাক হলাম, সাধারণত এরকমটা হয়না। সম্ভবত তীব্র রোদ এড়াতে সবাই পালিয়ে বেঁচেছে, তাছাড়া কেউ এখানে মাছ ধরতে পারে চিন্তা এতদূর অগ্রসর হবার কথা নয়। নেমে গেলাম পানিতে। মশারি দিয়ে মাছ ধরা যাবে কিনা সন্দেহ ছিল। সন্দেহ ভুল প্রমাণিত হল। অথবা এই লেকের মাছগুলো মহাবোকা। তারা বছরে এক-দুই দিন ছাড়া নিরুপদ্রব জীবন যাপন করে। খাবার দেয়ার আনন্দময় সময়টুকু ছাড়া অন্য কোন উৎপাতও সইতে হয় না।

মাছ ধরা চলছে এমন সময় লাল গিয়াস এক চিৎকার দিয়ে পুকুরের ভিতর দিকে সাঁতার দিল। গিয়াস মশারি আনার সময় পায়নি সুতরাং হাত দিয়ে মাছ ধরছিল। সে যখন তার মাছ তুলেছে দেখা গেল একটি মাছরাঙ্গা সাপ। ছেড়ে দিয়ে গিয়াস দীঘির মাঝের দিকে সাঁতার দিল সাপও একই দিকে, শুরু হয়ে গেল হুলস্থুল। গার্ডরা টের পেয়েছে, তাঁরা বাঁশি দিতে দিতে দৌড়ে আসছে। আমরা এই ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। গিয়াসকে ফিরিয়ে কোন মতে দেয়াল টপকালাম। বাঁশির শব্দে পুরো কলেজ ছুটে আসছে মনে হল, আমরা দৌড়ে রুমে ঢুকলাম। এই ব্যপারটি আগেই প্ল্যান করা ছিল। আমরা রুমে ঢুকেই বালতিতে মাছগুলো রেখে উপরে মশারি দিয়ে দিলাম, তার উপর সাবান আর ডিটারজেন্ট কেইস।

এডজুটেন্ট আর আর্মির ৪/৫ জন স্টাফ এসে হাজির হলেন। আমার রুম প্রথমে, আমার হাফপ্যান্ট এবং টাওয়েল জড়ানো খালি গা দেখে জানতে চাইলেন কি করছি, বললাম স্যার গোসল করতে যাচ্ছি। অনেকেই গোসল করতে যাচ্ছে হাতে বালতি, খালি গা, টাওয়েল জাড়ানো। এটা গোসলের সময়, আর এই গেটআপ নিতান্তই স্বাভাবিক। কলেজে লুঙ্গি বা অন্য কোন ব্যক্তিগত পোশাক রাখার নিয়ম নেই।

সবগুলো রুম ঘুরলেন কিছু পেলেন না। আমার ধারণা উনারা কল্পনাও করতে পারেননি আমরা মাছ ধরেছি। এবার একে একে রুম চেক শুরু হল। আমার খাটের নিচে মাছ ভর্তি বালতি অন্যদের মত সরাতে পারিনি। কারণ আমার রুম প্রথমে, আর মাছ ধরার স্পট থেকে শেষে। আমার রুমে একজন স্টাফ ঢুকলেন, মাছগুলো এখনো জীবিত, নড়ে চড়ে উঠছে আর প্লাস্টিকের বালতিতে শব্দ হচ্ছে। রুমে কিছু পেলেন না। যখন বেড়িয়ে যাবেন মাছগুলো জোড়ে নড়ে উঠল। উনি বাইরে গিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ালেন, নিচু হয়ে খাটের নীচ দেখলেন। কিছু নেই।

এডজুটেন্ট ও স্টাফরা দাঁড়িয়ে কিছু আলোচনা করল, তাদের চোখে মুখে একধরণের বিস্ময় এবং হতাশা। আমার রুমমেট রেজওয়ান অসম সাহসী মানুষ বালতি নিয়ে ওদের পাশ দিয়ে গোসল করতে চলে গেল। সব যখন শান্ত। মাছ গুনে দেখলাম ২৪টা ছোট বা মাঝারি সাইজের রুইমাছ। এখন রান্না হবে কি করে? অনেক প্ল্যান হয় কিন্তু কাজ হয়না।


পর্ব-০৩

আমাদের হাউস থেকে কিছু দূরে একটি পানির পাম্প আছে যেখান থেকে পুরো কলেজে পানি সাপ্লাই দেয়া হয়। বিরাট উঁচু পানির ট্যাংকের নিচে একতলা ঘর। বাহারের দুলাভাই কলেজের একজন শিক্ষক সেই সূত্রে সে জানে ওখানে গেলে রান্না-বান্নার ব্যবস্থা হতে পারে। একজন তিন চারটা শার্ট নিলো, ওখানে আমাদের কাপড় আয়রণ করা হয়, আমাদের ওদিকে যাওয়া নিষেধ। কাপড় নিয়ে ধরা পড়লে সমস্যা হবে তবে সেটা খুব বড় হবার কথা নয়। দুজন গেল। তারা মাছ দেখে প্রলুব্ধ হল। ঠিক হল ২০০ টাকা আর ৪ টা রুই মাছ দিতে হবে তাদের। ভাতের চাল, মশলা সব আমাদের জোগাড় করতে হবে। মহাবিপদ।

বিকালের শিফটে ডাইনিং এর কর্মচারীরা ডিউটি-তে যাচ্ছেন, ডাইনিং হল আর ওদের থাকার কলনি হাউসের দুই দিকে, সুতরাং বেআইনি ভাবে ওরা আমাদের হাউসের পেছনদিয়ে যাতায়াত করে। তানা হলে বড্ড দূর হয়। সাইকেল না থাকলে এতদূর হাঁটা কষ্টের ব্যাপার। আমাদের হাউস নিচতলায়। রুমের পিছন দিকে মস্ত জানালা। অপেক্ষার পালা শেষ করে তাঁরা এলেন, একজনকে চালের ব্যাপারটা গছানো গেল। বিনিময়ে ২টা রুই। এভাবে রাতে যখন খেতে বসেছি তখন আমাদের পাতে পড়ল ১১টা রুই, বাকি সব ঘুষ।

জানালায় কম্বল দেয়া হয়েছে। মাটিতে বিছানা। রাত দশটায় লাইটস অফ হয়ে যায়। তাই রাতে আলো জ্বালাতে হলে জানালায় কম্বল দেয়া হত। কাজটি করা হত খুব নিখুঁত ভাবে। তারপরও আমরা অতিরিক্ত সতর্কতা হিসাবে মোমবাতি জ্বালালাম। খেতে কেমন হয়েছিল নিজেরাই ভেবে দেখেন, এটাও আমাকে বলতে হবে? মাছ ধরতে ধরতে ক্লান্ত হয়ে গেছি।


 

Advertisements

One thought on “মাছ ধরা

  1. জানি না says:

    সমৃতি মনে পরে গেল….

    সেকেন্ড ইয়ার হলি ক্রস কলেজ…
    কলেজের নিয়ম ছিল সবাইকে বাটার জুতা পরতে হবে …. প্রতি সপ্তাহ তে জুতা চক দিয়ে সাদা করা বিরক্ত ই লাগতো …. কি মনে করে ক্লাস শুরু হওয়ার আগে খুব খুঁজে পেতে একটা জুতা কিনলাম যা কিনা বাটার জুতা না তবে ধরা একটু মুসকিল… আমি বুঝলাম মুসকিল কিন্ত পিরনসিপাল জোসেফ মেরীর কাছে মুসকিল না….. ধরে ফেললো …. ওয়ারনির দিল যাতে আর কখনো না করি…… হুম জুতা তো কিনবোই না …. আমাদের যখন পিটি হতো তখন অন্য ক্লাসে র পিটি হতো না…. বন্ধুদের মধ্যে খোঁজ করলাম কার জুতা আমার পায়ে লাগে …. পেয়ে গেলাম… জুতা চেনজ করা শুরু করলাম….. কিন্ত আবারো জোসেফ মেরী …. চশমা তো পরতো না …. কিন্ত চারটা চশমা সাথে লাগিয়ে ঘুরতো….. বুঝে গেল আমার শয়তানি…. সারাসি অভিযান চালিয়ে সেকেন্ড ইয়ারে ৪০০ সুটডেনটের মধ্যে পাঁচ টাকে পেল….. রুমে ডেকে নিয়ে গেল….. দেখা গেল সব গুলা মানবিকের…. ইকোনোমিকস বই বের করলো বলল পরের দিন পাঁচটা চ্যাপটার লিখে নিয়ে এসে দেখাতে হবে …. আর তা ক্লাস শুরুর আগে….

    সারা রাত ধরে সবচেয়ে ছোট চাপটার বের করে লিখা আর লিখা …. সকালে রুমে গেলাম সিসটার জোসেফ মেরী কে কর্ম তুলে দিতে….. মুখের দিকে তাকিয়ে কোনো কথা না বলে টুকরো টুকরো করে সব ছিরে ফেলে দিল…….

    তোমাদের ডাইনিং জুতা না পরে যাওয়ার কথাতে মনে পরে গেল….. হিসাবটা জানি কেমন তোমরা ও পাঁচ আমরাও পাঁচ শাস্তি ও পাঁচ চাপটার

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: