৪০ পয়সার ঋণ খেলাফি।

সূত্রঃ ০১-ঋণ নেয়া ।

খুব স্পষ্ট করে দিন তারিখ সংখ্যা মনে নেই। অপরাধের কথা লিখতে বসে মনে হলো মনের গহীনে লুকিয়ে রাখা কষ্টের কিছুটা যদি বলা হয় মনের ভার অনেক খানি নেমে যায়। স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট কাউন্সিলর, মনোবিদ, মানসিক ডাক্তার এবং মুরুব্বীরা বলেন শুধুমাত্র বলতে পারলে মনের অর্ধেক কষ্ট কমে যায়। “শেয়ারড সরো ইজ হাফ সরো”।

ঘটনাটি ২০০২ এর কোন এক সময়ের হবে বোধহয়। আমার এক কলিগ এবং বন্ধুর মা খুব অসুস্থ, তিনি মায়ের চিকিৎসার জন্য লোন নেবেন। বাংলাদেশের একটি নামকরা এনজিও’র নাম ব্যবহার করে সেই ব্যাংকটি তখন চুটিয়ে ব্যবসা করা শুরু করেছে। সারা বাংলাদেশের সব এলিজিবল লোকজনকে লোন দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে বিশাল অংশ নিচ্ছে। লোন দেয়ার বিষয়গুলো এত দ্রুত এবং সহজ করে ফেলেছে যে, যে কোন লোক বিপদে পড়লে কিংবা কোন একটি বিলাস দ্রব্য কেনার ইচ্ছা হলেই তার ব্যাংকের কথা মনে পড়ে যায় এবং সে একটি লোন নিয়ে ফেলে।

কেউ কেউ আজকাল ব্যাংকগুলোকে নব্যমহাজন নামে ডাকেন। আমার অবশ্য সুদের কারবারি বলতে বেশি ভালো লাগে। আগের মহাজন আর বর্তমান মহাজন-দের কাজকর্ম চরিত্র একই হলেও একটি বড় পার্থক্য আছে। ‘আগের মহাজনদের দুটো পা ছিল’। সে সব মহাজনরা গ্রামের মহল্লার ধনী ব্যক্তি ছিলেন। কৃষক-রা খুব বিপদে পড়লে গিয়ে তার দুটো পা জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চাইতে পারতো। সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি, অন্দরমহলের চুরির টুং টাং তাদেরকে প্রভাবিত করতে পারতো। কোন কোন মহাজনের আবার হৃদয়ও ছিল আবেদনকারী বাড়তি সময় কিংবা সুদ মওকুফ পেয়ে যেতেন।

বর্তমান মহাজনদের সারাদেশ জুড়ে অফিস, শত শত, হাজার হাজার হাত, বিপদে পড়া মানুষ মাফ পাওয়ার জন্য তাদের “পা” খুঁজে পায়না। ‘কাষ্টমার সার্ভিস’ বলে একটি আপাত ‘পা’ দৃশ্যমান হয়ে উঠলেও সেই পা ক্ষমা করার অধিকার রাখেনা, কারণ সেই পা’এর সাথে হৃদয়ের কোন সম্পর্ক নাই। আগের মহাজন ‘জন’ ছিলেন এখনকার সুদের কারবারিরা ‘ব্যাংক’। মানুষের হৃদয় থাকে, প্রতিষ্ঠানের থাকে সিস্টেম সুতরাং বলা যায় এখনকার মহাজনদের নির্দিষ্ট কোন ‘পা’ নেই। হৃদয় থাকারতো কোন কারণই নেই। বর্তমানকালে সিএসআর (কর্পোরেট সোশ্যাল রেপন্সিবিলিটি) নামে একটি হৃদয় নামক বস্তু তৈরির চেষ্টা হচ্ছে, সমস্যা একটি-ই সেই বস্তুটি প্লাষ্টিকের তৈরি। তাতে মমতা থাকে না, থাকে মার্কেটিং নামের ভয়াবহ একটি সংক্রামক রোগ। অন্যদিন এই দুটি বিষয়ে আলোচনা করা যাবে। আজ বরং নিজের অপরাধের কথা বলি।

আমার সেই কলিগের একজন গ্যারান্টর লাগবে আমি সাথে গিয়েছি। কাষ্টমার সার্ভিসেস ম্যানেজার আমাদের সাথে অত্যন্ত ভাল আচরণ করলেন, আমরা রীতিমত মুগ্ধ। আমার লোনের প্রয়োজন নেই, কিন্তু কি করে কি করে আমাকেও কনভিন্স করে ফেললেন। আমি আচরণে মুগ্ধ হয়ে লোনের আবেদন করলাম, উনি বললেন আপনি ক্রেডিট কার্ডের উপর লোনের আবেদন করেন পেতে সুবিধা হবে। আমি তাই করলাম। ৩ দিন বলা হলেও ১০ দিনের মাথায় মোটামুটি আমাদের লোন এসে গেল। ১২ টি ব্ল্যাঙ্ক চেকের পাতা সাইন করে আরো কি কি যেন দিলাম।

আমার একাউন্ট চেক করে দেখলাম টাকা ৪.৫%  কম এসেছে। জানতে চাইলাম। কি ব্যাপার। সে বললো এমনতো হবার কথা না ! প্রোসেসিং ফি একটা আছে কিন্তু সেটাতো অনেক কম ! এখন মনে নেই ১ কিংবা ১.৫ % ছিল তখন । ‘ভাই চিন্তা করবেন না আমি আপনাকে জানাচ্ছি, দুটো দিন সময় দিন’ ।

কিছুদিন পর ম্যানেজার সাহেব আমাকে সরি বললেন। ক্রেডিটকার্ডে লোন নিলে ৪.৫ % দিতে হবে। এক লক্ষ টাকায় ৪৫০০ টাকা কম পেলাম। একটা একাউন্ট খুলতে হয়েছিল সেখানেও কিছু টাকা দিতে হয়েছে ।  যাই হোক টাকা পয়সা, কম-বেশি আমার কাছে কখনোই খুব একটা জরুরী ছিলনা।

সব ঠিক ঠাকই চলছিলো। আমি হঠাত চাকুরী বদলে ঢাকা চলে এলাম। ব্যাংকে যোগাযোগ করলে তারা বললেন এটা কোন সমস্যা নয় আমাদের অনলাইন ব্যাংকিং, আপনি আপনার কাছের ব্রাঞ্চে জমা দেবেন। আমি শুনে আনন্দিত হয়ে ঢাকায় চলে এলাম। টাকা পয়সা ধার করা এবং তা শোধ দেয়ার ব্যাপারে আমার সব সময়ই একধরণের সমস্যা কাজ করে। যে ব্যক্তি ধার নিয়ে ঠিক তারিখে শোধ দেয়না, এবং পরিস্কার ভাবে বলেনা কি তার সমস্যা আমার মানদন্ডে সে একজন খারাপ মানুষ। আমি খুব সচেতন ভাবে এই ক্রিয়া এবং তার সাথের প্রক্রিয়াকে ঘৃণা করেছি ছোটবেলা থেকে।

আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। আমার বাবার কিছুদিন পর পর বদলী হত। আমি স্কুল থেকে এসে দেখলাম বাসার সামনে একটি ট্রাক দাঁড়ানো এবং আমাদের মালপত্র সব তোলা হয়েছে। অর্থাৎ আমাদের বদলি হয়েছে কোথাও। আমার বাবা তার অফিসের গল্প কোনদিন আমাদের সাথে করেন নি। কোন ক্ষোভ কোন আনন্দ কিছুনা । আমি এসে গাড়ীতে উঠলাম। আমি কোথায় যাচ্ছি জানিনা। আমার স্কুলের বন্ধুদের কাছে বিদায় নেয়া হয়নি।

স্কুলে আমাকে এক চটপটি ওয়ালা বিচিত্র কারণে স্নেহ করতেন। সেদিন আমি দু’টাকা প্লেটের স্পেশাল ফুল প্লেট চটপটি খেয়ে এসেছি। পয়সা ছিলনা, কিন্তু দেখে লোভ হচ্ছিল। সব কিছু ছাপিয়ে আমার কেবলি মনে হতে লাগলো আমিতো টাকাটা দিয়ে আসতে পারলাম না। আব্বুকে বললে এই সমস্যার সমাধান হয় যায় বা যেত এখন বুঝি। সে সময় আব্বুকে আমি আসমান জমিনে সবচেয়ে বেশি ভয় পেতাম। কেন পেতাম জানিনা। তিনি জীবনে খুব একটা মারেননি। সারা জীবনে দু-একবার চর থাপ্পরের কথা মনে পড়ে। রাগ হয়েছেন খুবি কম কারণ এক বাসায় থেকেও আমার সাথে সপ্তাহে একবার দেখা হতনা। আমার ভেতরেই বিচিত্র কোন ব্যাপার হয়তো ছিল, ঠিক জানিনা।

আমি ১০ বছর পর সে টাকা ফেরত দেয়ার জন্য সেই চটপটি ওয়ালাকে খুঁজতে শুরু করেছি। যখন পেলাম তার ছেলে চটপটি বিক্রি করছেন তখন, তার বাবা মারা গেছেন বেশ কয়েক বছর আগে। গল্পটা এজন্য করলাম ঋণের ব্যাপারে আমার এক ধরণের এলার্জি আছে। এলার্জি’র বাংলা কি হওয়া উচিত? অতিসংবেদনশীলতা? কে জানে আমি বাংলা, ইংরেজী কোনটাই ভালো জানিনা।

সেই অতিসংবেদনশীলতা বা এলার্জির কারণেই আমি সব সময় কিস্তির চেয়ে বেশি টাকা জমা দিতাম। ৫০ কিস্তির লোন ছিল, ৪৭ কিস্তি দেয়ার পর একদিন লোন-কালেকশন বিভাগ থেকে এক ব্যক্তি ফোন করলেন। করে বললেন আপনি টাকা পয়সা ঠিকমত দেননা কেন? আমি বললাম দেখুন আমার ৫০ কিস্তির লোন ৪৭টি দেয়া হয়েছে। তিনি বললেন না একটা কিস্তি মিস আছে দিয়ে দেবেন। আমি বললাম সরি আমি ঠিক জানতাম না কোন ফাঁকে মিস হয়ে গেছে, আমি সামনের মাসেই দুই কিস্তি একসাথে দিয়ে দেবো। সে বলল না কালই আপনি দিয়ে দেবেন। আমি বললাম ঠিক আছে। কিন্তু ভাই যে লোক ৪৭ কিস্তি ঠিকমত দিয়েছে সে বাকী তিন কিস্তিও দেবে এটুকুতো আপনি বোঝেন, এতটা রূঢ় না হলেও পারতেন। একটা ‘রিমাইন্ডার-ই” যথেষ্ট ছিল। সে উত্তর করলো ‘আপনিতো কোন সময়ই টাকা পয়সা ঠিকমত দেননা’। এই বলে বিচিত্র ভঙ্গিতে কুৎসিত ভাবে হেসে উঠলো। আমি বললাম ‘আপনি জানেন না আপনি কার সাথে কথা বলছেন’ অর্থ করতে চাইলাম ‘একজন সৎ’ মানুষের সাথে কথা বলছেন ! সে স্বাভাবিকভাবেই অন্যকিছু বুঝলো যে আমি ক্ষমতা দেখাচ্ছি। তারপর যা হলো আমি শুধু বিস্মিত হলাম। বাংলাদেশে বেসরকারি চাকুরেদের কোন ক্ষমতা থাকেনা। অসৎ হতে ক্ষমতা লাগে, সৎ হতে ক্ষমতা লাগেনা। সুতরাং সব সৎ মানুষই আসলে ক্ষমতাহীন অক্ষম মানুষ।

আমি একদিকে বেসরকারি চাকুরে, তার উপর সৎ মানুষ, মানে ডাবল “অক্ষম” মানুষ। খুব কষ্ট পেলাম, পেয়ে একটা চিঠি লিখলাম ঐ ব্যাংকের এইচআর বিভাগ এবং কাষ্টমার সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্টে। তাঁদের ধন্যবাদ তারা ফোন করে ক্ষমা চাইলেন। তারপর ফোন করলেন কালেকশন বিভাগের প্রধান। তিনি সেদিনকার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন। তার কন্ঠে কেমন একটা বাঁকা ভাব ছিল। কথাগুলো ছিল এমন আপনার সাথে এমন কিছু হয়নি, যাইহোক যদি কিছু হয়ে থাকে তাহলে যেন ভুলে যাই। আমি বললাম আপনাদের রেকর্ডিং ফ্যাসিলিটি নাই? কি কথা হয়েছে শুনে নিন। সে বলল না এখনো হয়নি। তারপরই সেই কুৎসিত হাসি আমি বুঝলাম এই সেই লোক যার সাথে আমি কথা বলেছিলাম। বললাম শোনেন ভাই, আমরা ছোটখাট চাকুরী করি, টাকা মেরে দিয়ে কোথায় যাব? তাও ৪৭ কিস্তি দেবার পর? যারা টাকা মেরে দেবার জন্য নেয় তাদের কাছ থেকে টাকা উঠায়ে দেখান। আপনি তাদের ফোন করার সাহসও রাখেন না। বলে আমি ফোন রেখে দিলাম।

যে ব্যাংকার আমাকে ফোন দিয়েছিল তাকে ফোন দিলাম, জানলাম কালেকশন বিভাগ, প্রথমে বিরক্ত করে, তারপর মাস্তানি করে, তারপর অফিসে গিয়ে অপমান করে, সামাজিকভাবে হ্যারাস করে, রাস্তাঘাটে উত্যাক্ত করে, মাস্তানি করে এমনকি হিজড়া পাঠিয়ে সারাদিন বাসার সামনে নাচ-গান, খিস্তি-খেউড়ও করার উদাহরণ আছে।

আমি বললাম ঠিক আছে কিন্তু আমার সাথে কেন? আমিতো টাকা দিচ্ছি ! সে দুদিন সময় নিল। তারপর যা জানলাম আমি তাতে লজ্জিত হলাম কারণ ভুল আমরা, বিরাট ভুল। আমি ২৮ নম্বর কিস্তি (এখন মনে নেই) মিস করেছি। আমি বেশিরভাগ সময় মাস ঠিক রেখে দিতাম না, এডভান্স দিতাম, কিস্তির চেয়ে বেশি টাকা দিয়ে রাখতাম, সুতরাং মিস হবার সুযোগ ছিলনা, ঐ নিয়ে ভাবতামও না। এখন কি হয়েছে আমি যখন ২৯ নম্বর দিচ্ছি ওরা ধরে নিচ্ছে ওটা ২৮ নম্বর। এবং আমি ২৯ নম্বর খেলাফি। আবার যখন আমি ৩০ নম্বর দিচ্ছি ওরা সেটা ২৯ নম্বর ধরে নিচ্ছে, আমি ৩০ নম্বরের খেলাফি। এই ভাবে আমি আসলে প্রতিমাসেই একজন কালপ্রিট এবং আমার অপরাধের কোন সীমা নাই। আমি কালেকশন বিভাগের প্রধানের কথা কিছুটা বুঝতে পারলাম।

আমি লোন দাতা ম্যানেজার সাহেবকে বললাম কিন্তু একটা রিমাইন্ডার দেয়া যেত যে এই আপনার সমস্যা সমাধান করেন ! আর আমি যে অতিরিক্ত টাকা দিলাম সেগুলো গেলো কই? সে বলল একাউন্ট মেন্টেনেন্স ফি আছে, লেট ফি আছে, লেজার ফি আছে আরো কতো কি, আপনার সব টাকাতো লেট ফি দিতে দেতেই গেছে। তারপর অনলাইনে টাকা পে করছেন সেখানে ফি আছে…………আরো কতোকি! রিমাইন্ডার না দিয়া ভালোই করছে, করলে এত টাকা কাটবো ক্যামনে?

সূত্র ০২ – আমি ঋণ খেলাফী।

৫০ তম কিস্তি দেয়ার পরে এই ব্যাংকের উপর আমার মন এতটাই বিগড়ে গেছিল যে আর যাব রুচি হচ্ছিল না। যদিও আমার এক ব্যাংকার বন্ধু বলেছিল গিয়ে একাউন্টটা ক্লোজ করে দিতে। ২০১২ সালে একটা কাজের জন্য কয়েক জন বন্ধু আবার লোন চাইলো, তারা পে করবে শুধু আমার নামে লোনটা নেবে, যেহেতু আমার কোথাও কোন লেনদেন নেই। নিজের বাড়িতে থাকি, বাবা’র একটা পরিচয় আছে, একটি মাত্র ভাই বিদেশে খবু ভাল অবস্থানে আছে, স্ত্রী ডাক্তার আমার লোন না পাওয়ার কোন কারণতো নেই। ও ভালো কথা আমার চাকুরীতে উন্নতি হয়েছে আমিও একটি নামি কোম্পানিতে মোটামুটি ভাল বেতনে মধ্য পর্যায়ে চাকুরীরত। সুতারং ওরা আমাকেই ধরলো। আমি লোনের কথা বলতেই সেই ব্যাংক ঝাঁপিয়ে পড়লো লোন দেবার জন্য। ১০ দিনে লোন দেবার কথা, তারা ২০ দিন যায় হচ্ছে, হবে, ৪০ দিন যায় সবাই পালিয়ে বেড়ায়।

আমি এক কথার মানুষ, না দেন বলে দেন দেব না, তাও বলে না। কি যন্ত্রণা ! আমি যখন খুব জেদ ধরলাম ঐ ব্যাংক থেকে সব টাকা তুলে নিলাম তখন তাদের ভেতরে একজন বলল। স্যার আপনার সিআইবি খারাপ এসেছে। আমি বললাম আমার সিআইবি খারাপ আসার কোন কারণ থাকতে পারেনা। কথাটা আমাকে বললে আমি সমস্যা সমাধান করবো কিন্তু এটা কি ধরণের আচরণ? তিনি বললেন লজ্জায় কেউ আপনার সাথে কথা বলতে পারছিলনা। একজন উর্ধতণ কর্মকর্তাকে কি করে আমরা বলি তার সিআইবি রিপোর্ট খারাপ? আমি বারবার প্রশ্ন করেও কোন সদুত্তর পেলাম না কোন ব্যাংক আমার নামে অভিযোগ করেছে।

এক ব্যাংকার বন্ধু বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগাযোগ করতে বলল, সেখানে আমার বিশেষ পরিচিত একজন কাজ করে, তার সহযোগিতায় জানলাম আমি কোথাও থেকে লোন নিয়েছিলাম সেই লোন আমি পরিশোধ করিনি। লোন জীবনে একবারই নিয়েছি সুতরাং সেই ব্যাংকে যোগাযোগ করলাম।

কাষ্টমার সার্ভিসেস এর বিশাল লাইন পার করে দিয়ে যখন সেখানে পৌঁছাতে পেরেছি তখন সেই অফিসার আমার একাউন্ট খুঁজে পাচ্ছিলেন না, কারণ তাকে শুধু নাম আর ব্রাঞ্চ দিয়ে খুঁজতে হয়েছে আমি একাউন্ট নম্বর দিতে পারিনি। অন্য একজনের সহযোগিতায় যখন পেলাম, আমি জানতে চাইলাম আমার সমস্যা কি? উনি একটু হেসে বললেন সমস্যা একটাই আপনি একাউন্ট ক্লোজ করেননি। আমি বললাম কিন্তু টাকাতো পরিশোধ করেছি ! উনি বললেন সব পে করার পর আপনার ৪০ পয়সা বাকী ছিল। বললাম খুব ভালো কথা আমিতো সব সময় অতিরিক্ত পে করেছি তাহলে বাকী থাকে কি করে? অনেক চার্জেস আছে। তাছাড়া আপনি সময়মতো টাকাও পরিশোধ করেননি। একটি কিস্তি নিয়ে অনেকদিন ঝামেলায় ছিলেন। আমি তাও মেনে নিলাম কিন্তু একটা ফোন করে আমাকে জানানো হলনা কেন? যাই হোক ২৫০০ টাকা দিয়ে সেই একাউন্টের লেনদেন শেষ করেছি।

সূত্র-০৩-অপরাধ অনেক করেছি এবার শাস্তির পালা।

সব ক্লিয়ার হয়ে যাওয়ার পর একটি ব্যাংক আমাকে লোন দেবার জন্য উঠে পড়ে লাগলো, অন্য একটি ব্যাংক ক্রেডিট কার্ড দিতে চায়। যথারীতি এবারো তারা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, কোন ঝামেলায় বাড়ি চলে গেছেন আরো কত কি। বুঝলাম ঝামেলা কিছু একটা আছে। আবার যোগাযোগ করলাম এক বন্ধুর সাথে তিনি বললেন বাংলাদেশ ব্যাংকে রিপোর্ট আছে আমি “লো প্রায়রিটি কাষ্টমার” সুতরাং আমাকে লোন বা কার্ড দেয়া হবেনা। আমি এবার অবাক হলাম।

আবার খোঁজ নিলাম, ৪০ পয়সার ঋণ খেলাফি এত বাজে লোকের সাথে কি কেউ কথা বলতে চায়? অনেক কষ্টে যা জানলাম তা হলো সেই ব্যাংকের এক কিস্তি করে আমি অনেক কিস্তি মিস করেছি সুতরাং ব্যাংকটি আমার নামে অভিযোগ করেছে আমি পেমেন্ট নিয়ে সব সময় গাফিলতি করি। তার উপর বিভাগীয় প্রধানের নামে করেছি অভিযোগ শাস্তি আমার পাওনা।

আমার অনেকদিনের সুনামে কালিমা লেগে গেল। এখন আমি একজন ঋণ খেলাফি। সুতরাং সাবধান ! !

আরেকটি ছোট কথাঃ

একটি টিএনটি ফোন নিলাম বাসায়। কিছুদিন পর সেই ফোনে ফোন আসে আর আমার স্ত্রী-কে উত্যাক্ত করে। একদিন আমি বাসায়, বার বার ফোন আসছে। আমি ফোন ধরলাম বললাম আপনি আমার স্ত্রী-কে বিরক্ত করছেন ক্যানো? মেয়েদের কন্ঠ শুনলে হুস থাকেনা? সে শুরু করলো এইভাবে আপনার স্ত্রী-র মত ঐ রকম মাগী রাস্তা ঘাটে অনেক আছে……………” বাকীটা লেখা সম্ভব নয়। এক পর্যায়ে বুঝলাম ফোনটি যিনি আগে ব্যবহার করতেন তিনি একজন চাকুরিজীবি, হঠাত চাকুরি চলে যাওয়ায় লোন পরিশোধ করতে পারেননি। ব্যাংকের যন্ত্রণায় ফোন বদলেছেন।

গালিগালাজ একটু কমলে আমি বললাম ভাই আমি সেই ব্যক্তি নই, এই ফোন আমি নোতুন নিয়েছি। কে শোনে কার কথা, প্রতিদিন আমার ওয়াইফ-কে জ্বালাতন করেই চললো। সেই ফোন লাইনটি আমি কেটে রেখে দিলাম। ব্যাংক সেই একই।

উপসংহারঃ

আমরা যারা এইসব ব্যাংক থেকে লোন নেই তারা কি জানি আসলে কত পার্সেন্ট লোন আমাদের দিতে হয়? ধরুন আমি ১ লক্ষ টাকা লোন নিয়েছি ১২% সুদে। তাহলে তিন বছর মেয়াদি লোন হলে আমাকে ৩৬০০০/- শোধ করতে হবে। খুবি সোজা অংক।

সমস্যা হলো অন্যখানে। আপনি হিসাব করছেন ১ লক্ষ টাকায় ১২% সুদ। কিন্তু প্রথম মাসেই আপনি কিস্তি পরিশোধ করেছেন আনুমানিক ৩৭৭৮/-। তাহলে আপনি আসলে ১ লক্ষ টাকা ব্যবহার করেছেন মাত্র ১ মাস। ৩৫ তম মাসে আপনি ব্যবহার করেছেন মাত্র ২৭৭৮/-টাকা আপনি সুদ দিয়েছেন কিন্তু ১ লক্ষ টাকার উপর।

আসলে আপনাকে যে সুদের হিসাব দেয়া হয় সেটা সরল সুদের হিসাব। ইফেক্টিভ রেট কত হয় জানলে ফিট হয়ে যাবেন। তার উপর প্রসেসিং ফি দিচ্ছেন। এটা সেটা বুজরুকি চার্জের অভাব নেই। আর যদি দু’ চারটা কিস্তি মিস করতে পারেন আপনি আমার মতই একজন ঋণ খেলাফিতে পরিণত হবেন।

Advertisements

3 thoughts on “৪০ পয়সার ঋণ খেলাফি।

  1. জানি না says:

    মন্তব্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি…… বাপরে ব্যাংকার রা এতো ভয়ংকর ….. বন্ধুরা তো দেখছি বেশীর ভাগই ব্যাংকার….

    কপালে তার মানে দুক্ষ has!

    Like

  2. Nimo says:

    সমস্যা ব্যাংকারদের নয়, ব্যাংকিং সিসষ্টেমের। ওরা কি সুবিধা ভোগী। ওদের ভূমিকা হলো বৃটিশ শাসনামলের ভারতীয় সৈনিকদের মত।

    Like

    • জানি না says:

      Innovative thinkings needed…. I don’t think so any banker do a favour against complaints that come from their clients….

      Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: