একটি হাসপাতাল এবং একটি স্মৃতি।

গ্রীক দেবতাদের নামে একটি হাসপাতাল আছে ঢাকায়। হাসপাতালটি প্রথম বড় বেসরকারী হাসপাতাল। কয়েকজন সফল ব্যবসায়ী একটি ভাল মন এবং সুন্দর অগ্রসর চিন্তা থেকে এই হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করেছেন।

বাংলাদেশে সরকারি হাসপাতালগুলোর অবস্থা আমরা সবাই জানি, ঐ প্রসংগটিকে ব্যবচ্ছেদ করার আর বাকি কিছু নেই। বেসরকারী হাসপাতালগুলোয় বড় বিনিয়োগ কেউ করেনি। যত্রত্ত্র  ক্লিনিক ব্যবসা বাংলাদেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সরকারি হাসপাতালের এক শ্রেনীর অসাধু ডাক্তার এবং আমলাদের কারণেই তা হয়। যাদের টাকা পয়সা আছে তারা যেতে থাকেন ভারত, সিংগাপুর এবং ব্যাংককে।

ঠিক এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে একটি বেসরকারী ভাল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে দেশ ও দেশের মানুষের যে উপকার তাঁরা করেছেন তা অবর্ণনীয়। স্বপ্ন ছিল বিদেশমুখী মানুষগুলোকে ঘরে ফেরানো, ভাল চিকিৎসা নিশ্চিত করা। মার্কেট যেহেতু বড় এবং শূন্য, এটা যে ব্যবসা সফল হবে সেতো আর বলার অপেক্ষাই রাখেনা। ভাল যন্ত্রপাতি, ভাল নার্স, ভাল সিস্টেমে কাজ শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। পেরিয়েছে অনেক চড়াই উতরাই। নতুন প্রতিযোগিতায় এসেছে আরো হাসপাতাল।

কিন্তু জাতিগতভাবেই মনে হয় বাংলাদেশের মানুষ সেবামুখী নয়। সেবার প্রসংগ আসলেই আমাদের প্রাণ ভরা মায়া, নিয়ন্ত্রণহীন আবেগ কোথায় যেন হারিয়ে যায়। বাস কন্ডাক্টর থেকে শুরু করে মন্ত্রী পর্যন্ত কেমন যেন একটা আবেগহীন ক্ষমতার দৌড় প্রতিযোগিতায় নেমেছি আমরা। যে যেখানে আছে সে সেখানেই ক্ষমতার উলঙ্গ প্রকাশের চেষ্টায় উন্মত্ত হয়ে থাকে। এই দৌড়ে হাসপাতালের ডাক্তার এবং সেবিকারা বেশ ভালো অবস্থানে আছেন। সেখানে সব ক্ষমতাবানরাই অসহায়, যেমনটি নাপিত রাজার কান ধরে টানার ক্ষমতা ভোগ এবং উপভোগ করে তৃপ্ত হয়।

বাংলাদেশ একটি অদ্ভুত দেশ এখানে কোন স্বাস্থ্যনীতি নেই। যে ডাক্তার যেমন খুশী ভিজিট নেন। নামের পাশে যা খুশী তাই ডিগ্রি লাগান। বিসিএস-ও নাকি একটি ডাক্তারি ডিগ্রি !!!

২০১২ সাল আমার মেয়ের জন্ম হয়েছে একটি ছোট হাসপাতালে। সময়ের আগেই জন্ম হওয়ার কারণে কিছু সমস্যা জন্ম নেয়। আমাদের সংসারে অনেকদিন পর একটি মেয়ে সন্তানের আগমনে আমরা যারপর নাই আনন্দিত হয়েছি। আমার ছোট ৯ বছরের ছেলেও তার বোনের আসন্ন বিপদ টের পেয়ে তাকে দ্রুত অন্য হাসপাতালে নেয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে “বাবা দেরি হয়ে যাবে, আর চিন্তা করার দরকার নেই, বাবা তাড়াতাড়ি করো”।

আমি সেই আকুল আবেদন এখনো শুনতে পাই।

বাচ্চার বয়স তখন ১ দিন। আমি অফিসে, আমার স্ত্রী আমাকে ফোন করে চিৎকার করে কাঁদছে। আমি অফিস থেকে রওনা দিয়েছি, আমার ড্রাইভার অস্থির হয়ে গিয়ে তিনবার একসিডেন্ট করতে করতে বেঁচে গেছে। জানি এখন একটা এক্সিডেন্ট হলে বিপদ বাড়বে, কমবে না। ড্রাইভারকে পাশে বসিয়ে নিজে গিয়ে বসলাম ড্রাইভিং সীটে। প্রচন্ড মানসিক চাপের ভেতরে গাড়ী চালাচ্ছি, আর ভাবছি বেঁচে আছেতো? শেষ রক্ষা হবেতো?

আমার বাবা এবং মা বাচ্চা নিয়ে রওনা দিলেন বিখ্যাত সেই হাসপাতালের দিকে, আর আমি সব গুছিয়ে আমার সিজার হওয়া স্ত্রীকে নিয়ে রওনা দিলাম তার কিছুক্ষণ পর। ট্রাফিক জ্যামের কারণে হাসপাতাল পৌছাতে দেড় ঘন্টা লাগলো, রোগী ভর্তি করতে করতে লাগলো আরো দেড় ঘন্টা। তিন ঘন্টায় মেয়ে তখন সম্পূর্ণ নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। এনআইসিইঊতে নেয়া হলো তাকে।

হাসপাতালটির এনআইসিইঊ দোতলায়, আর ডাক্তারের পরামর্শে আমাদের যে কেবিন দেয়া হলো সেটি দশ তলায়। প্রতি এক ঘন্টা পরপর আমার স্ত্রীকে নিচে নামতে হয় ব্রেষ্ট ফিড করার জন্য। সদ্য সিজার হওয়া একজন মা,  যিনি ২৪ ঘন্টা রাত জাগেন, তাকে অনেকটা পথ হেটে যেতে হয়।

আমরা আবেদন করলাম একটি হুইল চেয়ার দেয়ার জন্য, তারা আমাদের জানালেন বাচ্চা যেহেতু এখানে হয়নি সুতরাং মায়ের কোন চিকিৎসা বা সুবিধা দেয়া হবে না। আমরা বললাম দেখেন প্রতিদিন ৮৫০০ টাকা প্লাস অন্যসব চার্জ মিলিয়ে আমি ১০,০০০/- টাকা পে করছি কেবিন ভাড়া বাবদ, আমার মেয়ের সব খরচের বাইরে, আপনারা পেপার দিচ্ছেন, টিসু, টাওয়েল কতকি দিচ্ছেন, আমাদের ওসব দরকার নেই, প্রয়োজনে আলাদা পেমেন্ট নিন কিন্তু এই অমানবিক কষ্ট আপনারা দিয়েন না। হাত দিয়ে দেখালাম হুইল চেয়ারগুলো খালি পড়ে থাকে, তারা বললো আমাদের ম্যানপাওয়ার শর্ট আছে। বললাম ‘ঠিক আছে আমি ঠেলে নিয়ে যাব’, উত্তর ‘নিয়ম নাই’।

এদিকে আমার স্ত্রীর ব্যান্ডেজ চেইঞ্জ করা দরকার, অতিরিক্ত নড়াচড়ার কারণে তার সেলাইয়ে সমস্যা হচ্ছে, টান লেগে ব্যাথা হচ্ছে এখানে কেউ দেখবেন না। একদিন মনে আছে খুব ব্যাথা একটি সাপোজিটরি দরকার, সবাই সেটি দিতে অস্বীকার করেছে। গভীর রাত, আমি কি করবো বুঝতে না পেরে এর কাছে ওর কাছে যাচ্ছি, একজন এটেনডেন্ট দয়া করে একটি সাপোজিটরি এনে দিয়েছিল। আমার জানা ছিলনা, টাকা পয়সা, বকসিসের ব্যাপার এখানে ভালোই চলে!

আমার স্ত্রী ডাক্তার সে পরিচয়ে পরিচিত হবার পর আমার মেয়ের যিনি কন্সালটেন্ট তিনি সব শুনে খুবই অসন্তুষ্ট হলেন, এবং বললেন ‘তোমরা কি নিয়ম দেখাচ্ছ? ১ দিনের বাচ্চা ভর্তি হলে তার সাথে তার মা-ও থাকবেন এটাই স্বাভাবিক। কি করে তিন দিন তোমরা সিজার করা পেশেন্টকে এভাবে কষ্ট দিলে?’ তারপর সিদ্ধান্ত হলো আমাদের হুইল চেয়ার দেয়া হবে। কিন্তু বেশির ভাগ সময় যেটা হলো তাদের লোক থাকেনা। আমার স্ত্রীকে হেঁটেই যেতে হয়। আমি তার কষ্ট দেখে মাঝে মাঝে হাতটা ধরি। নার্সদের ইনচার্জ মুখ বাঁকা করে কমেন্ট করে বসলো “নাটক, আমরা রোগী আর দেখিনা”।

আমার স্ত্রী বললো শুনেছো? আমি বললাম বাদ দাও। একদিন এই মেয়ের বাচ্চা হবে, এই কষ্ট করবে এবং সেদিন মনে মনে তোমার কাছে ক্ষমা চাইবে। সেই সেবিকা রূপবতী মেয়ে, কি করে এতটা নিষ্ঠুর হল আমি বুঝলাম না !

এর মধ্যে আরেকটি মজার সমস্যা হলো, একটা ছোট পানির জগ দেয়া আছে এবং তাতে কোন পানি দেয়া হয়নি। আমরা সংগে করে যা পানি এনেছি সব শেষ। ওদের কাছে জানতে চাইলাম পানির কি ব্যবস্থা? তারা খুব প্রফেশনাল উত্তর দিল, ‘আমাদের এখানকার পানি খুবই স্বাস্থ্য সম্মত, আপনি এই পানি নিশ্চিন্তে পান করতে পারেন, আমাদের এটেনডেন্সকে বললে সে পানি দিয়ে যাবে’।

খুশী হয়ে চলে এলাম।

জগটিতে পানি ধরে দুই গ্লাস। ২৪ ঘন্টায় তিনবার পানি চেয়েছি বলে সেই রূপবতী মেয়েটির পাশ থেকে একজন বলে বসলেন, ‘উনার ওখানে একটা পানির কল লাগিয়ে দিয়ে আসো’ ! তারপর থেকে আমি মিনারেল ওয়াটার আনিয়ে খেয়েছি।

হাসপাতালটির এমডি আমাকে এক সময় স্নেহ করতেন, বলেছিলেন কোনদিন যদি এসে সমস্যায় পরো আমার রুমের দরজা ধাক্কা দিয়ে ঢুকে পড়বে, আমি তা করলাম না, কাষ্টমার সর্ভিসের হেডকে ফোন দিলাম, তিনি ডিউটি ম্যানেজারকে পাঠাবেন বললেন, কিন্তু ডিউটি ম্যানেজার আসতে পারছেন না জানিয়ে জুনিয়র একজনকে পাঠালেন। তাকে বললাম সব। সে একটি কাগজে টুকে নিল। কি করেছেন, আদৌ কিছু করেছেন কিনা, আমি জানিনা। কিন্তু যতবার ঐ হাসপাতালে যাই তাদের হৃদয়হীন আচরণের কথা মনে পড়ে।

কোন এক বিখ্যাত ব্যক্তি বলেছিল,
‘One may forget what you do, but he/she will never forget how you made him/her feel’
Advertisements

One thought on “একটি হাসপাতাল এবং একটি স্মৃতি।

  1. জানি না says:

    ….. সবই তো ভালো ….. ছিল বা এখনো আছে …..

    …. কোথায় তাহলে গরমিলটা হয়ে গেল…..

    এই কি তবে বাংলাদেশ …… যার জন্য এতোটা সময় পার করা…. ভালো অভিজ্ঞতা গুলো দিয়ে কেনো সব ধরে রাখা যায় না

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: