উপহার  ১


আমার প্রিয়তম বন্ধুর নাম ছিল নাইম। ক্লাস ফাইভে তার সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়। এত ভাল বন্ধুত্ব আমার আগে কারো সাথে হয়নি। আমি যখন আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে অন্যত্র চলে যাই তখন সে আমাকে তার ঠিকানা দিয়েছিল এবং একটি অসম্ভব সুন্দর স্ট্যাম্প বুক। আমার জীবনে এত ভাল উপহার আমি তখনো পাইনি। নাইম আমাকে চিঠি লিখতো ‘প্রাণের বন্ধু নাইম’ বলে। আমি হঠাত ক্যাডেট কলেজে চলে যাই, এবং সেখানকার ডামাডোলে এই বন্ধুকে হারিয়ে ফেলি।

আমার প্রথম উপহার যতদূর মনে পড়ে মজনু ভাইয়ের দেয়া দুটো বই, আমি সিওর না অন্য কেউও হতে পারে। দুটোই ইসলামী গল্পের, বাচ্চাদের জন্যে লেখা। আমার জীবনে প্রথম বই উপহার পেয়ে ভাল লেগেছে এবং খুব আনন্দের সাথে সেই বই পড়েছি। উপহারটি আমি ঘ্যান ঘ্যান করে বা কান্নাকাটি করে আদায় করছিলাম যতদূর মনে পড়ে। বই দুটি আমার সাথে প্রায় সারাজীবন ছিল। কিন্তু কিছুদিন পর পর বাসা পরিবর্তন, আর বাসা ভর্তি মেহমান এবং বন্ধুদের অত্যাচারে আমার বইয়ের সংখ্যা কোনদিন বাড়েনি। ঐ বই দুটিও হারিয়ে ফেলেছি।

বই উপহার দিলে তার সাথে একটা আশা থাকে উপহার পাওয়া প্রিয় ব্যক্তি বইটি পড়বেন। আমি জীবনে অনেক মানুষকে বই উপহার দিয়েছি তারা সে বই পড়েননি। বই মনে হয় একমাত্র উপহার, যে দেয় সে কিছু একটা বলতে চায়, বোঝাতে চায়। যা সে নিজের যোগ্যতায় পারেনা। লেখকরা ক্যামন করে যেন মনের সব ভাব চুরি করে লিখে ফেলে, কবিতা পড়ার পরে মনে হয়, আরে এতো আমার কথা ! আমি ঠিক বলতে পারিনি, বোঝাতে পারিনি।

বই সে কবিতা, গদ্য, ফিকশান যাই হোক না কেন কিছু বলতে চায়। বই উপহার দেবার পর যদি কেউ তা না পড়ে ক্যামন যেন একটা যন্ত্রণা হতে থাকে। আমি জীবনে অনেক অখাদ্য বই এই কারণে গিলেছি। একটি কবিতা পড়ার জন্য একটি বই কিংবা একটি সমগ্র আমি অনেককে উপহার দিয়েছি, তারা জানায়নি কবিতাটি ক্যামন লেগেছে। আমার আজো জানতে ইচ্ছে করে।

শান্তায় চাকুরী করি সেখানে আমার ইডি সাহেব ছিলেন বড় ভাইয়ের মত। এক্স ক্যাডেট, বুদ্ধিমান একজন মানুষ। একদিন আমরা একই মাইক্রোবাসে আসছি, গাড়িতে ১০/১১ জন কলিগ। ইডি সাহেবের অনেকগুলো অভ্যাসের মধ্যে একটা ছিল গাড়িতে উনি অসম্ভব মজার মজার কথা বলতেন। হঠাত জানতে চাইলেন বলেনতো উপহার দেয়া কঠিন না নেয়া কঠিন? সবাই বলল দেয়া কঠিন, আমি বললাম নেয়া কঠিন। রাইট এটিটিউড নিয়ে উপহার নেয়া একটা আর্টের পর্যায়ে পড়ে । এবং সে জন্য মন বড় হতে হয়, মলিন মন নিয়ে, ছোট মন নিয়ে উপহার নেয়া যায় না। আমি মানুষ হিসাবে সাধারণ, আমাকে কেউ কোন উপহার দিলে আমি নার্ভাস হয়ে যাই।

আমার দেখা পৃথিবীতে রাইট এটিটিউড নিয়ে উপহার নেয়ায় সেরা মানুষ ছিলেনে আমার দাদা। তাকে যদি কেউ তিন টাকা দিয়ে একটা বল পয়েন্ট পেন কিনে দিত, উনি এমনভাবে তা নিতেন যেন আকাশের চাঁদ পেড়ে দিয়েছে কেউ। এবং এই মুহুর্তে বল পেনের চেয়ে দরকারি আর কিছু নেই। সেই উপহারের গল্প সে এমনভাবে করতো, যে দিয়েছে তাঁর মনটা ভরে যেত, বুকের ছাতি ফুলে উঠতো। আমার দাদি ছিল ঠিক উল্টা তাকে সোনার গয়না দিলেও হাতে নিয়ে বলতো “ওজন একটু কম হইছে”।

জাওহার মামা আমার দেখা অন্যরকম একজন মানুষ। উনি বাংলাদেশের খ্যাতিমান দাবাড়ু এবং অন্যতম মেধাবী খেলোয়াড়। তাঁর গল্প আলাদা করে লেখার ইচ্ছে আছে। আজকে শুধু তাঁর উপহার দেয়ার গল্প বলি। মামা নিয়ম করে উনার প্রিয়জনদের সাথে দেখা করতে যান, এবং বাসার সবার জন্য কোননা কোন উপহার অবশ্যই নিয়ে আসেন। উপহারের টাকা জোগাড় না হলে দেখা করতে আসেন না। যেহেতু তিনি খেলা ছাড়া নিয়মিত কিছু করেন না, উপহারের টাকা জোগাড় করা প্রায়ই কঠিন হয়। এসব আমার অনুমান, উনি এসব নিয়ে কোন কথা বলার মানুষ নন।

উপহারের নমুনা দিলে কিছুটা বোঝা যাবে, নানা নানি’র যেহেতু বয়স হয়েছে তাদের জন্য ৫০০এমএল জুস। আমার ছেলে যেহেতু পড়াশুনা করে তার জন্য একটি পেন্সিল। আমার মেয়ের জন্য একটি টেনিস বলের মত কিছু একটা। ঔষধ রাখার জন্য প্লাস্টিকের বাক্স ইত্যাদি।

উপহারের কোন মূল্য হয়না। কিন্তু উপহার দেয়াটা যে কতবড় শিল্পের পর্যায়ে পড়ে এটা মামা-কে দেখে কিছুটা শেখার চেষ্টা করেছি, যদিও সেই শেখা খুব কাজে লাগেনি। কারণ মামার মত এত ডেডিকেশন আমার নেই। উনি জুসের বোতল একটি বাক্সে ঢুকিয়ে সেটাকে অদ্ভূত সুন্দর র‍্যাপিং পেপারে র‍্যাপ করবেন। এত সুন্দর র‍্যাপিং পেপার কোথায় পাওয়া যায় আমি জানিনা। তারপর সেই র‍্যাপিং করা বোতলটি একটি সুন্দর সরু ডিজাইন করা চটের ব্যাগে ঢুকাবেন। সেই চটের ব্যাগের দুই সাইডে কাপড়ের পাড়ের মত রঙ্গিন ডিজাইন।

সবাইকে ডেকে ডেকে কুশল বিনিময় করবেন আর মুখে বলবেন সব ফাঁকি এনেছি, কিছু মিছু’র গল্পের মত। বার বার এই কথা বলতে বলতে লাজুক হাসবেন। এই মানুষটি মেঘনা নদীর সমান একটা হৃদয় নিয়ে জন্মেছেন কিন্তু দুকুল প্লাবিত করে ভালোবাসার বন্যা বইয়ে দিতে পারেননি কখনো। তাকে এই কষ্ট নিয়ে মারা যেতে হবে, ভালোবাসা বুকে বহন করা কঠিন, মাঝে মাঝে তা প্রকাশ করতে হয়। যারা পারেনা তারা মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে যেতে বাধ্য। এই মানুষটিকে আমি নিজে কোন উপহার কোনদিন দেইনি। উপহার নিয়ে উনি কি করেন এটা আমার দেখার ইচ্ছে আছে, খুব দ্রুত এই শখ পূরণ করতে হবে।

মার্ক টোয়েন মানব জাতির বড় কিছু ক্ষতি করেছেন এর মধ্যে একটা হলো চুরি জায়েজ করা। এক শ্রেনীর মানুষ থাকে তাঁরা বই কিনেই যায়, আরেক শ্রেণীর মানুষ সেই বই মেরে দেয়। সে মেরে দেয়া বই পড়েও না। কারন যে বই পড়ে সে কেনেও। আজকাল বইয়ের যে দাম তাতে বই চুরি গর্হিত অপরাধ হওয়া উচিত। আরেকটা সমস্যা হয়। বাজারে যখন যাই কত অজানা, অচেনা বই, সব কিনতে ইচ্ছে করে, পড়া বই আবার কিনবো হয়ে ওঠে না। সুতরাং মার্ক টোয়েন ব্যাটা অতি ভুলভাবে বলে গেছেন “ বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয়না” । তরে কইছে ! বই বিক্রি করে যদি বড়লোক হওয়া যায়, লিখে যদি কোটিপতি হওয়া যায় তাইলে কিনেও গরিব হওয়া যায়!

মানুষ অতি আজিব প্রাণি। বই চুরি করে গর্ব করার লোকও অনেক দেখেছি। বই চোরদের পীর সাহেব মার্ক টোয়েনের কথা তারা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে, এটি হল তাদের বীজ মন্ত্র। ভদ্রলোক আরো অনেক কিছু বলেছেন সেগুলো মানার ব্যপারে কোনো আগ্রহ দেখা যায়না।

আমার এক প্রতিবেশী-কে দেখেছি তার মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানের হিসাব করছেন। কি পরিমান উপহার আসবে, তার আনুমানিক মূল্য কত হবে তা নিয়ে রীতিমত গবেষণা করে ফেলেছেন। বিয়ের পর কেউ উপহার সরিয়ে ফেলেছে কিনা সেগুলোর জন্য উপহার প্রদানকারীকে আবার ফোন করে জিজ্ঞাসা করেন কি কি দিয়েছেন। আমি উপহার পাবার পর ফোন দিতে দেখেছি সেটি ধন্যবাদ দেবার জন্য। বিয়েতে যে পরিমান খরচ হয় তা বড় ধরনের অপচয়। বর কনে নতুন জীবন শুরু করে অপচয়ের অভিশাপ নিয়ে।

আমার ছেলে জন্মদিন করা নিয়ে মাথা খারাপ করে ফেলে, তাকে অনেক সুন্দর সুন্দর প্রস্তাব দিয়েছি সে তাতে রাজি হয়না। আমার সব সময় মনে হয় আমার ছেলের জন্মদিন আমার পরিবারের জন্য খবুই গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদের খুব আনন্দের বিষয় হতে পারেনা। আমরা যখন দাওয়াত করি তখন তাদের ভদ্রতা করে আসতে হয়, সারাদিন অফিস করে ক্লান্ত হয় আবার পোশাক আশাক পরিবর্তন করে, ঢাকা শহরের জ্যাম ঠেলে আসে। এর ভেতরে উপহার কিনতে হয়, আজকাল ফুল, ফল, খেলনা’র যা দাম তাতে বাজেটে চাপ পড়া স্বাভাবিক, আর মাসে যদি এরকম পাঁচটা অনুষ্ঠানে যেতে হয় তাহলে টাকা ধার করা ছাড়া উপায় থাকেনা।

কষ্ট করে কেনা এই উপহারে অনেক দোয়া থাকে আমি বিশ্বাস করিনা। থাকে অনেক বিরক্তি, ক্লান্তি এবং অবসাদ। “তোর ছেলের জন্মদিন তুই আনন্দে ধেই ধেই করে নাচ, আমাকে কষ্ট দিচ্ছিস ক্যানো?” আমি এসব যখন বুঝিনা তখন থেকেই আমি বিয়ে এবং জন্মদিন থেকে দূরে থাকি। আমার ছেলেকে অনেক পটানির পর সে স্বীকার করেছে জন্মদিনের মূল আকর্ষণ “অনেক খেলনা পাওয়া যায়”! আমি নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছি ছেলেকে বোঝাতে তুমি যেদিন বড় হবে তোমার জন্মদিন অন্যরা আনন্দ নিয়ে পালন করবে।

উপহারের ভেতরে ভীতিকর উপহারও আছে। আমার বাবা, ১৯৯২ সাল হবে বোধ হয়, একটা কম্পিউটার কিনে দেবেন। দুই ভাইয়ের উপহার। আমরা কিনতে গেছি কিন্তু কোনটা ভাল তার কিছুই বুঝতে পারছিনা। শেষে ফ্লোরা থেকে কিনলাম কম্প্যাক। তার র‍্যাম ছিল ২এমবি, প্রসেসর স্পিড ৩৩ মেগাহার্জ, হার্ডডিস্ক ২৫০ এমবি। কেনার পরের দিন ডেলিভারী হল, একজন বিশিষ্ট ইঞ্জিনিয়ার বেশ কয়েকজন লোকজন নিয়ে গাড়ি হাঁকিয়ে এলেন এবং সেটি ইনষ্টল করলেন। বলে গেলেন এসি-তে রাখতে হবে, জুতা পড়ে এই ঘরে ঢোকা যাবেনা। ইলেক্ট্রিক ফ্লাকচুয়েশনের জন্য মাইক্রো থেকে আনা হলো ষ্ট্যাবিলাইজার।

ঊপহার পেয়েছি কিন্তু কম্পিউটার অপারেট করতে কেউ জানিনা। ভয়ে ভয়ে স্টার্ট দেই আবার বন্ধ করি। গ্রাম থেকে এক আত্মিয় এসেছে তাকে অনেকক্ষণ বোঝালাম জিনিষটা কি। তিনি শুনে বলেন “ও বুঝছি একধরনের টেলিভিশন, এতো বুঝান লাগবো না”। কিছুদিন পড় সেই কম্পিউটার দুম করে শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেল।

রবীন্দ্রনাথের চারটি বই উপহার পেলাম বাবার এক ব্যাচমেটের কাছ থেকে, ফরিদ আংকেল। আর্মিরা বই পড়া পছন্দ করেনা বলেই জানতাম। উনি কি মনে করে আমার জন্য বই কিনলেন বুঝতে পারিনি। উনার সাথে আমার খুব পরিচয়ও নেই তখন। আমি আর্মিদের সংগত এবং অসংগত কারণে ভয় পাই, দুরেও থাকি। বই পেয়ে আমি যার পর নাই অবাক হয়েছি এবং উনাকে একটা চিঠি লিখে ধন্যবাদ দিয়েছি।

আমি উপরে লিখেছি উপহার পেলে নার্ভাস হয়ে যাই, কারণ লিখি নাই। প্রথম কারণ উপহার নিতে জানিনা, দ্বিতীয় কারণ উপহার দিলে প্রতি উপহার দেয়ার একটা ব্যাপার থাকে। আমি কেনাকাটার ব্যাপারে আনাড়ি বরাবর। এখন ফিক্সড প্রাইস দোকান হওয়ায় একটু সুবিধা হয়েছে। আরেকটি কারণ একটু জটিল এবং আমার মনে হয় এটাই আসল কারণ। কিছু মানুষ আছে যার সাথে আমার ঠিক উপহার দেয়া নেয়ার সম্পর্ক না। এর ভেতরে কর্পোরেট উপহারও আছে। এরা সম্পর্ক করার জন্য দেয়। আমি তখন নার্ভাস হয়ে যাই এই কারণে আমি এই সম্পর্ক এনজয় করিনা, যে সম্পর্কের পেছনে কোন উদ্দেশ্য কাজ করে। আবার উপহার না নিলে যে ঔদ্ধত্ত্য প্রকাশ পায় বা অন্যকে ছোট করা হয় সেটা আবার আমি করতে পারিনা। এই দোটানায় পড়ে আমার ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা।

সবচেয়ে পিকুলিয়ার উপহার পেয়েছি এবং পাই আমার এক কলিগের কাছ থেকে। তাঁর কথা আজ লিখলে চাকুরী নিয়ে টানাটানি লাগবে, সুতরাং ভবিষ্যতের জন্য তোলা থাকুক। এরপর লিখলে মাইর খাবার সম্ভাবনা আছে। আজ এখানেই শেষ করি।

 

 

Advertisements

2 thoughts on “উপহার  ১

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: