উপহার-২

আমাকে জীবনে কোন কোন সময় অল্পদিনের জন্য হলেও বড় খালার বাসায় থাকতে হয়েছে। বাবার চাকুরীর ধরণ এমন-ই ছিল। কোন এক ঈদে আমি খালার বাসায়, আমার বয়স তখন খুবই কম। কেউ একজন টকটকা লাল একটি কাপড় নিয়ে এসেছে ঈদের দুদিন আগে, আমজাদ ভাইয়ের দোকানে দেয়া হবে জামা বানানোর জন্য। আমার তিনজন খালাতো বোন। তিন জনই পরীর মত সুন্দর, তারা যা পড়ে তাতেই মানায়। কাপড়টি এই তিনজনের কারো হবে, এখন মনে নেই। আমি কি কারণে যেন ঐ কাপড় দিয়ে শার্ট বানানোর জিদ ধরলাম, আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করা হল যে এটা আমার নয়, এটা মেয়েদের জন্য। আমি মাটিতে গড়িয়ে কান্না শুরু করলাম। ভয়াবহ সেই কান্না।

আমার ছেলে মেয়ে এখন কেউ এই কাজ করলে চড় বসিয়ে দিতাম। আমার মায়াবতী খালা মুখ বিরস করে বসে রইলেন। আমি সেটা নেতিবাচক ধরে নিয়ে আরো জোড়ে কান্না করতে লাগলাম। আমার এই খালার ৫ ছেলে মেয়ে। তারা পড়াশুনা করে। যে ছোট সে আমার বয়সী। খালুকে বলি কাকা কারণ সে আমার চাচাও হয়। কাকা সরকারী চাকুরী করেন। এত বড় সংসার, তাছাড়া সে সময়ের মানুষেরা বাবা-মা-কে দেখতো, বোন-ভাইদের অসুখ, সুবিধা-অসুবিধায় পাশে দাঁড়াত। আরেকটা খুব মজার ব্যাপার ছিল। বিশাল বাসাটি একটি বিনা পয়সার হোটেল ছিল। এখানে খাওয়া এবং থাকা ফ্রি। চেক-ইন টাইম ২৪ ঘন্টা।

ফ্রি হলেই মানুষ আসবে এমন কথা নেই, কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। বরিশাল বন্দরের ঠিক সামনে এই বাসা, হাঁটা পথ। সকাল, দুপুর, রাত যখনই লঞ্চ বা স্টিমার আসে বা যায়, তারা এসে বিশ্রাম করে এই বাসায়। খাওয়ার সময় হলে খায়, ইচ্ছে হলে ঘুমায়। বরিশালের একমাত্র মেডিক্যাল কলেজ, জেলখানা সব এই বাসা এবং এর যাতায়াত পথের উপর পড়ে। কোর্টতো হাটাপথ। সুতরাং বিরামহীন এখানে অতিথি আসে এবং যায়, আজ প্রশ্ন জাগে এদের অতিথি বলা যায় কি? একটি উপজেলার সব পরিচিত এবং স্বল্প পরিচিতরাই এই সুবিধা ভোগ করতো। আর অসুবিধা ভোগ করতো আমার খালা। তিনি দিনরাত দুশ্চিন্তা করতেন সংসার চালাবেন কি করে। গ্রাম থেকে চাল-ডাল আসে কিন্তু এতবড় লঙ্ঙ্গড়খানা চালানোর জন্য সে আর কতো? বড় ছেলে এসব দেখে শুনে চাকুরীতে ঢুকে গেল অল্প বয়সে।

আমি এই খালার বাসায় থেকে কিছুদিন পড়েছি। সে সময় একটি উপহার আমি নিয়মিত পেতাম। একটি ছোট সাইকেল ভাড়া পাওয়া যেত, পঞ্চাস পয়সায় এক ঘন্টা। প্রতিদিন বিকেলে আমি খালার কাছে গিয়ে দাঁড়াতাম আর এই পয়সা নিয়ে এক দৌড়ে যেতাম সাইকেল ভাড়া করতে। সাইকেল চালানোর সেই আনন্দের কোন তুলনা নেই।

এই বাসায় অনেক অতিথির ভেতরে একজন ছিলেনে একটি টেইলর্সের মালিক, আমজাদ ভাই। কসকো টেইলর্স নাম ছিল। এখনও মনে আছে, তার পাসের দোকানটির নাম ছিল বসকো টেইলর্স। কিছু কিছু মানুষ জীবনের লেনদেনের হিসাবে কাঁচা হয়, ব্যবসা তাঁদের জন্য নয়। আমি যদিও তখন খুব ছোট আমার ধারণা আমজাদ ভাই ব্যবসায় খুব খারাপ ছিলেন। পরবর্তিতে তাঁর ব্যবসাটি বন্ধ হয়ে যায়। পড়ে শুনেছি ঢাকায় দোকান দিয়েছেন, সেটা ব্যবসার সম্প্রসারিত রূপ নয় বলেই আমার ধারনা।

আমজাদ ভাই আমাকে দাবা খেলা শিখিয়েছেন। আমি উনার দোকানে গেলে মিষ্টি, মোগলাই আনিয়ে খাওয়াতেন। আর খেলতে গিয়ে কি করে যেন উনার মন্ত্রী সহজেই খেয়ে ফেলতাম। এবং খুশীতে লাফিয়ে উঠতাম। উনি যে শেখাতেন সেটার ভেতরে কোন মাষ্টারী ছিলনা। ছিল আনন্দ, কৌতুহল, উত্তেজনা আর প্রচ্ছন্ন উৎসাহ।

আমার এই খালার এক মেয়ে খুবই ভাল ছাত্রী, আমজাদ ভাই একদিন বললেন বিদ্রোহী কবিতা মুখস্ত করতে পারলে মোগলাই খাওয়ানো হবে। আমার সেই বোন তিনদিনে দাঁড়ি কমা সহ কবিতা মুখস্ত করে ফেলল। তখন মোগলাই-এর দাম ছিল তিন টাকা। তাতে ডবল ডিম দেয়া হয়, স্বাদ-ই অন্যরকম। সবচেয়ে বড় কথা আমাদের ছোটদের হাতে পয়সা দেয়া হতনা। আমাদের কালে এটি খুবই গর্হিত কাজ মনে করা হতো। সুতরাং আমজাদ ভাই প্রায়ই বিভিন্ন উসিলায় আমাদের খাওয়াতেন।

এই মানুষটির মলিন মুখ, বিরক্তি বা রাগ আমি কোনদিন দেখিনি। অন্যরা তাকে যে মাত্রায় পছন্দ করে, আমি নিশ্চিত তারাও দেখেনি। আমি যখন কলেজে পড়ি অনেকদিন পর আমজাদ ভাইয়ের সাথে আমার দেখা হয়। উনি বললেন ‘আমাকে চিনতে পারো?’ আমার মনে হয়েছিল আমজাদ ভাই হতে পারেন। আমি অবশ্য বললাম ‘না’। উনি কষ্ট পেলেন মনে। আর দেখা হয়নি। উনি যখন ঢাকাতে হাসপাতালে ভর্তি আমি আজ যাই কাল যাই করে একদিন শুনলাম উনি মারাই গেছেন, একটি বিষাদ আমজাদ ভাইয়ের স্মৃতির সাথে স্থায়ী হয়ে গেল।

এতসব উপহারের মাঝে বিব্রতকর উপহার দেয়া নেয়াও আছে। জাওহার মামাকে অনেকদিন বলেছি একটি ভালো দাবার বোর্ড আনার জন্য, উনি একদিন জানালেন দাম ১০০০ টাকা। সে সময় ২০ টাকায় দাবার ঘুটিসহ বোর্ড পাওয়া যায়। সুতরাং ১০০০ টাকার দাম ছিল। আমি মামাকে টাকা দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম কিনা জানিনা কিন্তু এডভান্স টাকা দেইনি। এটা মাথায় আসেনি যে, উনার পক্ষে এই টাকা যোগাড় করে, এটা নিয়ে আসা কঠিন হতে পারে। অনেক দিন পর, উনি বোর্ড নিয়ে এলেন। আগে কি কথা হয়েছে আমার মনে নেই। আমি উপহার মনে করে ঝাপিয়ে পড়লাম, ধন্যবাদ দিতে দিতে মাথা খারাপ করে ফেললাম। উনি মুখ অন্ধকার করে বসে রইলেন। আমি খেয়াল করলাম উনার মন খুব খারাপ কিন্তু বুঝতে পারলাম না কি হয়েছে, নোতুন উপহার পেয়ে আমার চিত্ত চঞ্চল আমি খুব পাত্তা দিলাম না।

অনেকদিন পর আমি হঠাত বুঝতে পারলাম ওটা উপহার ছিলনা !!! আমি সেদিন তাকে অসম্ভব বিব্রতকর একটা অবস্থায় ফেলেছিলাম, হয়তো তীব্র সংকটেও।

উপহার পেয়ে এখন আর কেউ খুশি হয়না। চমতকৃত হওয়ার সময় এবং যুগ শেষ। মূল্য আজকাল উপহারের জন্য খুব-ই জরুরী বিষয়। কি দিলেন, কত দিয়ে দিলেন। এবং যেহেতু সবাই সব জানে আজকাল আর ফাকি দেয়া যায়না। জিনিষ ধরেই বলে দিতে পারেন অমুক জায়গা থেকে কেনা হয়েছে, দাম এত !

“কৃতজ্ঞ চিত্তের চেয়ে বড় কোন সম্পদ নেই” এটাও জানা প্রয়োজন অকৃতজ্ঞ চিত্তের চেয়ে খারাপ কোন প্রাণী নেই।


 

Advertisements

One thought on “উপহার-২

  1. জানি না says:

    তোমার ধারনা যে সব সময় সবার ক্ষেত্রে ঠিক হবে তা না…..

    এখনো এমন মানুষ আছে রাস্তার দুটাকা মূল্যের জিনিস পেলে খুশী হয়, ফুচকা খাওয়ালে খুশী হয়….. এক সাথে বসে কফি খাওয়া কে উপহার হিসাবে মনে করে….. জন্মদিন বা অন্য কোন বিশেষ দিনে ফুল পেলে খুশী হয়…. লং drive টা কে উপহার মনে করে ….. গল্প করাটাকে উপহার মনে করে ….. এরকম অনেক ছোট খাটো বিষয় আছে যা কে উপহার মনে করে …..

    ….. বন্ধুর একটা চিঠি বা একটা কার্ড কে যক্ষের ধন মনে করে সব সময় রেখে দেয়….

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: