সুমেরিয়ান ট্যাবলেটঃ যেভাবে চিনি এই সভ্যতাকে।

পৃথিবীতে ব্যাখ্যাহীন প্রযুক্তি, নির্মান এবং বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক নিদর্শন যখন পাওয়া যায় আমরা অবাক হই এবং বিভিন্ন ধরনের হাইপোথিসিস রচনা করতে শুরু করি। মিশর ও মেক্সিকোর পিরামিড, বলিভিয়ার পুমা পুংকু, পেরুর নাজকা লাইন, মেগালিথিক এবং মনোলিথিক নিদর্শন সমূহ, গোবেকলি টিপে, হরপ্পা, মহেঞ্জেদারো, আর্ক অব কভেনেন্ট, ভয়নিক মেনুস্ক্রিপ্ট, নুহু নবীর নৌকা,  তিওতিকান, মারকাহুজি, চাচাপয়াস সংস্কৃতি, কৈলাস পর্বত, ইলোরা বা অজন্তার গুহাসহ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য অব্যাখ্যাত নিদর্শন। এসবের কোন সঠিক ব্যাখ্যা বর্তমান বিজ্ঞান অথবা মুল্ধারার নৃতত্ববিদদের কাছে নেই। তারা যে জানেনা তা নয়, তারা জানাতে চায়না। যখন কেউ কোন হাইপোথেসিস দাড় করায় এই মূল্ধারার মূল কাজ হয়ে উঠে তাকে হাস্যকর প্রমান করা কিংবা ভুল প্রমান করা। কেন মানব জাতিকে ওরা এইসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা থেকে সরিয়ে রাখতে চায় তার কারণ আমরা ধীরে ধীরে বুঝতে পারবো কিন্তু তার আগে আমাদের জানা প্রয়োজন বিস্ময়কর এবং ঐতিহাসিক সুমেরিয়ান ট্যাবলেট সম্পর্কে। 

সুমেরিয়ান কিউনিফর্ম ট্যাবলেট।

অস্টিন হেনরি লেয়ার্ড ১৮৪৯ সালের দিকে রাজা অসুরবানিপাল এর প্রাসাদ থেকে সুমেরিয়ান ট্যাবলেট খুঁজে পান। বৃটিশ এই নৃতত্ববিদকে আবিস্কারক হিসাবে সব ক্রেডিট দেয়া হলেও তিন বছর পরে তার সহকারী জনাব হরমুজ রাসাম একই সাইট থেকে দ্বিতীয় দফায় আরেকটি পাঠাগার খুঁজে পান। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত মোট ট্যাবলেটের সংখ্যা প্রায় ৩১০০০। বর্তমানে এই সব ট্যাবলেট বৃটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। কিউনিফর্ম পদ্ধতিতে লেখা এই মাটির গ্রন্থগুলোকে অনুবাদ করা ছিল একটি কঠিন প্রক্রিয়া । বর্তমানে প্রায় ২০০ গবেষক সুমেরিয়ান ট্যাবলেট পড়তে এবং বুঝতে পারেন।

কি আছে এই ট্যাবলেটে?

২০১৬ সাল। শত শত মিডিয়া পৃথিবীব্যাপী প্রচার করলো সুমেরিয়ান ট্যাবলেট-এর বর্তমান অনুবাদের বিস্ময়কর দিকগুলো। বর্তমান সভ্যতা জানতো যে সুমেরিয়ানরা মহাকাশ বিজ্ঞানে অনেক এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু তারা এর আগে ধারনাও করতে পারেনি সেটা কতটা। এখানে প্রমাণ পাওয়া যায় যে প্রায় 2,000 বছর আগে, প্রাচীন ব্যবিলিয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা রেনেসাঁ-যুগের পণ্ডিতদের মতো উন্নত ছিল।

যদিও কিউনিফর্মে লেখা এই মাটির ট্যাবলেট মূলত হিসাবরক্ষণের কাজে ব্যবহার হলেও কিছু কিছু শিলালিপি রয়েছে যা প্রাচীন মেসোপটেমীয়দের জীবনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ ধারন করে। এছাড়াও রয়েছে অপ্রত্যাশিত অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন আইন, বিজ্ঞান, গনিত। তাদের বিদ্যা এতই উচ্চ স্তরের ছিল যে, বৃহস্পতি গ্রহের কক্ষপথ এবং গতি নির্ণয় করা খুবই সাধারণ বিষয়ের একটি। বর্তমানে আমরা যে প্রক্রিয়া শিখেছি মাত্র ৫০০-৬০০ বছর আগে।

 খ্রিস্টপূর্ব ৩২০০-এ প্রাচীন শহর উরুকে সুমেরীয় শাসকদের দ্বারা প্রথম এই ট্যাবলেট লেখার কাজ শুরু হয় বলে প্রমান পাওয়া যায়। এছাড়াও সেসময় আকাদিয়ান ভাষার ব্যবহার দেখা যায় যা অ্যাসিরিয়ান এবং বাবিলীয় সাম্রাজ্যের প্রচলীত ভাষা ছিল। কিউনিফর্মের জায়গায় বর্ণমালা ব্যবহার শুরু হয় প্রথম খৃষ্টাব্দে। সেই তখন থেকে উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত এই ভাষা এক রকম হারিয়ে যায়।

১/ সুমেরিয়-সভ্যতা।

Advertisements

সুমেরিয় সভ্যতা।

পৃথিবীর সবচেয়ে পুরানো দিনগুলিতে আমরা কোন প্রশ্নের উত্তর খুঁজি না। আমরা খুঁজি বর্তমানে কারন বর্তমান মানেই আধুনিক, বৈজ্ঞানিক এবং সামনের। অতীত আমাদের সামনে ধোঁয়ার মত, পচা, গলা, অবৈজ্ঞানিক, অশিক্ষা, বন-জংগল, গুহা-মানব। আগের দিনের রাজা বাদশাদের বিরাট ইমারতগুলো আমাদের শুধু নিকট ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয় গৌতম বুদ্ধের ‘অনিচ্য’ বা নশ্বরতা’র কথা। এছাড়া এগুলো থেকে আমাদের গ্রহন করার কিছু নেই। বাড়ির পাশে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কেমন লোক ছিলেন আমরা নিশ্চিত জানিনা। হিন্দুদের ইতিহাসে একরকম লেখা, মুসলমান লেখকদের আরেক রকম আবার বৃটিশ বেণিয়া লিখেছে আরেকভাবে।

‘পৃথিবীর ইতিহাস রচনা করেছে বিজয়ীরা, কিন্তু ইতিহাসের আড়ালেও একটি ইতিহাস থাকে, সেটি সত্যিকারের গণমানুষের ইতিহাস” ইতিহাসের  বইয়ে চোখ রাখলে সেখানে শুধু যুদ্ধ আর যুদ্ধ। যে পরাজিত তার লেখার সুযোগ কোথায়? সুতরং যিনি জিতে গেলেন তিনি এক গন্ডা ভাড়াটে লেখককে দিয়ে নিজের বিজয়ের মহিমা লিখিয়ে নেবেন এটাই সংগত। ভাগ্যক্রমে যদি  এই লেখা পরবর্তি কোন বংশ বা আগ্রাসী রাজার হাত থেকে বেঁচে যায় আমরা পাই এক বিজয়ী রাজার এক পাক্ষিক জয়ের গল্প। আর যদি এগুলো পরবর্তি বিজয়ীদের হাতে আসে, তাহলে আবার বিকৃত হয়, হতেই থাকে।

তাই আজকের ইতিহাস ঠাকুর মা’র ঝুলি ছাড়া কিছু নয়। কার্ল মার্ক্স তাই ইতিহাস পড়ার একটি নিয়ম শিখিয়ে দিয়েছেন, ‘ঐতিহাসিক ভাবে আমরা যদি কট্টর দৃষ্টি গ্রহণ করতে পারি, সত্যের কিছুটা কাছাকাছি যেতে পারি’। বলা হয় আমরা যে ইতিহাস জানি সেটা ভুল ইতিহাস। বলা হয় মানুষের আসল ইতিহাস লুকিয়ে রাখা হয়েছে মানুষের কাছ থেকেই, এবং এই কাজও কিছু মানুষেরই। কি কারনে বলা মুশকিল তবে ঠিক এরকমটি হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে পুরাতন সভ্যতা ‘সুমের’ সম্পর্কে। পৃথিবীতে এর চেয়ে পুরানো সভ্যতা থাকলেও থাকতে পারে কিন্তু তার প্রমাণ অটুট নেই, যেরকমটি আছে ‘সুমের’ সম্পর্কে।

প্রাচীন মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে প্রথম সুমেরিয়ান সভ্যতার সুচনা ও বিকাশ ঘটে। সহজ করে বললে আজকের ইরাক এবং তার আসে পাশের কিছু অঞ্চল যেমন সিরিয়া ও তুরস্কের কিছু এলাকা নিয়ে এই মেসোপটেমিয়া। টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিস নদীর মাঝে গড়ে ওঠা দ্বীপটিতে সভ্যতার প্রথম প্রদীপটি জ্বলে ওঠার কারণ নিয়ে অনেক মতভেদ আছে, কিন্তু উঠেছিল যে সে সম্পর্কে কোন দ্বিমত হবার সুযোগ এখন আর নেই। 

খ্রিস্টপূর্ব ১০০০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ সালে এই সভ্যতার বিকাশ ঘটে বলে প্রমান পাওয়া গেছে। তার মানে ছয় থেকে বারো হাজার বছর আগে আমাদের এই পৃথিবীতে একটি উন্নত সভ্যতার বিকাশ ঘটে। কিন্তু মানুষ যখন গুহায় বাস করে, কৃষিকাজও শেখেনি সেই তখন আধুনিক এই সভ্যতা কি করে গড়লো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে নানা জটিলতা তৈরী হয়। তাই আমাদের অতি ক্ষমতাশীল সরকার ব্যবস্থা, মুলত যারা এই গ্রহ পরিচালনা করেন তারা সিদ্ধান্ত নিলেন এসব আমাদের (আমজনতার) না জানাই ভাল। কার ভালো তা কেউ জানেনা তবে পরিচালকদের জন্য ভাল এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।

বিগত ১৫০ বছরে ফ্রেঞ্চ এবং বৃটিশ আরিকিউলজিস্ট রা খুজে বের করেন উন্নত এই সভ্যতাকে। মানুষ বিস্ময়ের সাথে জানতে পারে সভ্যতার শুরুর ব্যখ্যাহীন ইতিহাসের কথা। এই প্রথম মানুষের কাছে মিশরের পিরামিড, মহেঞ্জেদারো, হরোপ্পা, গ্রিক দেব দেবী, হিন্দু দেব দেবী, ব্যবিলন এবং রোমের গড দের জন্ম এবং জ্বীন, দাজ্জাল সহ সকল ধর্মের রহস্য উন্মোচিত হতে শুরু করে একের পর এক।

যেরকম ভাবা হত সভ্যতার জন্ম গ্রিস থেকে, তা নয়, তার চেয়েও উন্নত সভ্যতার অস্তিত্ব পৃথিবীতে ছিল এটি জানার পর চমকে যায় পৃথিবী। টাইগ্রিস এবং ইউফ্রটিস নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সুমেরিয় সভ্যতায় প্রথম কৃষি কাজের সূচনা ঘটে। এই নদী দুটি যেমন পরিবহন সুবিধা দিয়েছে, তেমনি দিয়েছে মৎস্য আহরণ কেন্দ্রিক অর্থনীতি। সাত-আল-আরাব অঞ্চলের সমতলে এই জীবন যাত্রা গড়ে উঠলে দেখা যায় তারা পরবর্তী কালের কৃষি নির্ভর এলাকার মত প্রকৃতি নির্ভর নয়। তারা পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাবিত করবার মত জ্ঞান এবং সামর্থ্য রাখতো।

বিকেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থা ও সেবা, নগর পরিকল্পনা, লেখনী ও লিপি, ধর্মচর্চা, ব্যবসা-কেন্দ্র, বাণিজ্য পথ, বাড়ি এবং ভবন নির্মান সহ সকল প্রকার আধুনিক ব্যবস্থার সূচনা ও প্রসার হয়েছিল এখান থেকে। সুমেরিয়ান-রা এতটা উন্নত ছিল যে নদীতে বাধ নির্মাণ করে পানিকে ইচ্ছে মত প্রবাহিত করার প্রযুক্তি ও জ্ঞান তাদের ছিল। ঘরকে ঠান্ডা রাখার, বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা সহ নগর সৌন্দর্যের প্রতিও তারা যত্নশীল ছিল। মেয়েরা সোনা রূপা সহ অনেক ধরনের অলংকার পড়তো সে সময়, সে সব ডিজাইন এবং নান্দনিকতায় উন্নত ছিল।  

সুমেরিয়ানদের লিখিত এবং অলিখিত আইন কানুন ছিল এবং একে অপেরর সাথে লিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ হতো। বিংশ শতাব্দির শুরুর দিকে পারস্যের শহর সুসা’য় নৃতত্তবিদ্গন ব্যবিলনের রাজা হামুরাবি’র পাথরটি আবিস্কার করার পর দেখা গেল সকল প্রকার আইন কানুন এবং নীতিমালা এই পাথরটিতে খোদাই করা রয়েছে। ২৮২ টি অনুচ্ছেদে ভাগ করা এই আইন শীলাটি খ্রিশটপুর্ব ১৬৯৪ দশকের বলে ধারনা করা হয়। আইনে বিবাহ, বানিজ্য, সম্পদের উত্তরাধিকার থেকে শুরু করে সব ধরনের দৈনন্দিন বিষয় স্থান পেয়েছে। যেমন অনুচ্ছেদ ১৯৬ তে বলা আছে ‘চোখের বদলে চোখ’, পরবর্তিতে নবী মুসা’র সময় এই আইন দেখা যায় এবং অনেকের কাছেই এই আইন এখনও পরিচিত হবার কথা। সুমেরিয়ান সভ্যতার প্রধান শহর ছিল ৪টি গিরসু, নিপার, উরুক এবং অর।

2/ সুমেরিয়ান ট্যাবলেটঃ যেভাবে চিনি এই সভ্যতাকে।