উপহার ৩।

উপহার ১ এবং ২ লেখার পর মহাবিপদে পড়েছি। আমার আত্মিয় বন্ধু দাওয়াত দিয়ে বলে “তুই আসিস, গিফট আনতে হবে না”। এছাড়াও নানা রকম যন্ত্রণা আছে। আমার লেখা উপহারের বিরুদ্ধে না, বুঝতে পারছি যা বোঝাতে চেয়েছি তা পারিনি। পন্ডিত ব্যক্তিরা অল্প কথায় আসল ব্যাপার বোঝাতে পারে, যেমন আমার মূল বক্তব্য এক লাইনে পরিস্কার বলে দিয়েছেন মাদার তেরেসা।

“It’s not how much we give but how much love we put into giving.”

― Mother Teresa

আগের দিনে উপহারে দেয়া হত ফুল আর বই। ফুল কিনতে হয় এটা আমরা অনেক বড় হয়ে শিখেছি।  বাগান-লন-পথ-ঘাট-বন-বাদাড় এবং অন্য মানুষের বাসায় ফুল ফুটে থাকবে কারণে অকারণে ছিঁড়বো এটাই ছিল স্বাভাবিক। একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা দিবসে শহীদ মিনারে যেতাম সবাই। তখন নিরাপত্তার এত অভাব ছিলনা। নোংরা রাজনীতি এসব মহান জাতীয় অনুষ্ঠান থেকে দূরে থাকতো। এখন গিজ গিজ করে র‍্যাব, পুলিশ, গোয়েন্দা, তাদের হাতে অত্যাধুনিক্ সরঞ্জাম, অস্র, কমিউনিকেশন ডিভাইস, সারভিলেন্স এর যন্ত্রপাতি। কিন্তু নিরাপত্তার মানসিক স্বস্তি সেখানে নেই।

আমাদের বয়স যখন ৮/১০ তখন থেকেই কাছের শহীদ মিনারগুলোতে একা একাই যেতাম। রাতে অবশ্য আমরা ফুল চুরি করতাম, মুলত মহল্লার বিভিন্ন বাসা থেকে কিংবা সরকারি অফিস কমপ্লেক্স থেকে। এই চুরিতে কেউ কিছু মনে করতো না। শুধু যাদের গাছ, ডাল-পালা এবং অনেক সাধের ফুল সাবাড় করা হত তারা একটু কষ্ট পেত, আর সারারাত টেনশনে থাকতো তার বাগানে কি পরিমান ধ্বংস যজ্ঞ চলবে তা নিয়ে। পাশের বাসায় এক হিন্দু ভদ্রলোকের অনেক ফুল ছিল, উনি সারারাত টর্চ জ্বেলে বসে থাকতেন।

আরেকটি উপহার ছিল বই, সব সময় সস্তা। আগের দিনে লেখক মানেই গরীব, না খেতে পাওয়া, চোয়াল ভাংগা উদাস মানুষ। এখনকার ড্যান ব্রাউন সাহেবের মত ধনী লেখক ছিল না। শুনেছি উনার বছরে আয় ৬৫০ কোটি টাকা। তারপরেও উনার একটা বই বাচ্চাদের একটা খেলনার চেয়ে সস্তা।

উপহার হতে হবে স্বতঃস্ফুর্ত। ভালবাসা প্রণোদিত। বাধ্যতামূলক, সামাজিক, লোক দেখানো নয়। একবার আমার এক প্রিয় মানুষের বাসার কাছ দিয়ে যাচ্ছি, ভাবলাম অনেকদিন পর যাচ্ছি আবার কবে আসবো কে জানে একটু দেখা করে যাই। তিনি বেশ আপ্যায়ন করলেন এবং সাথে দুই কথা শুনিয়ে দিলেন হাতে করে কিছু নেইনি কেন। কোনো বাসায় গেলেই যদি কিছু নিয়ে যেতে হয় তাহলে হিসেব করে যেতে হয়। আমার সামর্থ্য আছে, মনও আছে। ঘনিষ্ট মানুষেরা জানে আমার সমস্যা দোকানে যাওয়া এবং কেনা নিয়ে। আমি দরদাম করতে হয় বলে ফিক্সড প্রাইস দোকান ছাড়া যাইনা। ঢাকায় এসব দোকান এখন অনেক হলেও আগের দিনে খুব কম ছিল। যখন দরদাম করে বিপুল পরিমান ঠকে আসতাম তখন মানসিক শান্তি বিঘ্নিত হত। এজন্য নয় যে আমার বেশি টাকা চলে গেল, একজন মানুষ প্রতারণা করছে এই অনভূতিই কষ্টের। একই কারণে আমি সরকারি অফিসেও যাইনা, বাবার বয়েসি লোকজন অবলীলায় ঘুষ চায়, এটা দেখলে মানুষ জাতির উপর বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়।

এখন অনলাইনে অনেক জিনিষ কিনি বলে আমার বাবা আমার উপর মহা খেপে আছেন, এটা আবার কি রকম শপিং? না দেখে, না বুঝে, দামও নিশ্চিত বেশি নেয়! দাম সম্পর্কে আমার নিজের একটা কৌশল খুব কাজে লাগে। এই আবিস্কারের পর থেকে কেনা কাটা নিয়ে আমার সুখ নিরংকুশ। কৌশলটি হলো পন্যের দাম কত এটা আমলে নিই না। এই পন্যটির জন্য আমি কত দাম দিতে চাই সেটা বিবেচনা করে আমি মূল্য নির্ধারণ করি, এবং ফলাফল খুবই আশাদায়ক। আমার মত ছাগল যারা আছেন এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে পারেন, ভাল ফল পাবেন। কেউ যখন কোন শপিং করে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করে এটার দাম কত বল দেখি? আমার উত্তর শুনে অনেকে অবাক হয়ে যায়, এত অনভিজ্ঞ একজন কিভাবে এত কাছাকাছি দাম বলে? তবে কাপড়ের দামের ক্ষেত্রে এখন একটু কঠিন হয়ে গেছে। এখন জিজ্ঞেস করতে হয় কোথা থেকে কিনেছেন?

সবাই দামী উপহার পছন্দ করে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু উপহার এর সংস্কৃতি হওয়া উচিত নির্মল। সেটা হতে গেলে সামগ্রিকে দেখতে হবে শুধু মাধ্যম হিসাবে। সামগ্রি কখনো আত্মার পরিমাপ হতে পারেনা। জানি এই পুজিবাদি, ভোগবাদী সমাজে এসব কথার কোন মানে নেই, তারপরও আমি আমার অবস্থান পরিস্কার করলাম।

উপহার যারা দেন আমি তাদের কথাই বলছি, যারা নেন তাদের কথা কম বলছি কারণ এটা গ্রহীতার মানসিকতার বিষয়, ভালবাসা পেয়েও যদি তার মূল্যায়ন করতে না পারেন তবে তার জন্য সমবেদনা। এ বিষয়ে অসাধারণ একটা উক্তি আছে।

“I know what I have given you…

I do not know what you have received.”

― Antonio Porchia

Advertisements