First Light

Victory Day 2017-1-25

Advertisements

আন্দোলন।

[লেখাটি সাম্প্রতিক ডট কম  এ ছাপা হয়েছে]

“The life of a student is a life of preparation for the struggle of life…”

জোরে জোরে পড়া শুরু করলাম যাতে সবাই শোনে। রিকশায় আমরা, তাতে কী! একটু পরে পরীক্ষা। অনুবাদ অংশটা তো পড়ি নাই কেউ। প্রথম লাইন পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধুম ধুম করে মাথায় স্কেলের বাড়ি পড়ল। কাঠের স্কেল দিয়ে কেউ মাথায় মারে! মাথা ফেটে গেলে কী হইত? রিকশায় আমার সিটের ওপরে বসা জিনাপ। ওই-ই ওর স্কেলটা দিয়ে সমানে আমাকে মেরে যাচ্ছে। ওর সবচেয়ে অপ্রিয় সাবজেক্ট এই বাংলা দ্বিতীয় পত্র। ও বলে, বাংলা ব্যকরণ পড়ার চেয়ে নাকি এইডস হওয়া ভাল!

এই রিকশায় আমরা যেই চারজন বসা—আমি, রিকি, কলি, জিনাপ—এই চারজনই বাংলা দ্বিতীয় পত্র সাবজেক্ট ঘৃণা করি, তবে বাংলা পড়ার চেয়ে এইডস হওয়া ভাল কিনা এই বিষয়ে আমাদের বাকি তিনজনের মনে একটু সন্দেহও আছে। তাই আমি ছাড়া বাকি দু’জন, রিকি আর কলি, মারধর না করলেও সমানে জিনাপকে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে, মার, মার, ওকে আরো মার।

আমরা চারজন মিলে এই উঁচু-নিচু রাস্তাওয়ালা চট্টগ্রাম শহরে একটামাত্র রিকশায় চড়ে স্কুলে যাচ্ছি! দ্বিগুণ ভাড়ায় এক রিকশা নিয়ে, দুইজন রিকশার সিটের উপরে আর দুইজন নিচে বসার একটাই উদ্দেশ্য, মন খুলে হা হা হি হি করা! এই সময়ে আমি ছাত্রজীবনের বোরিং অনুবাদ পড়তে গেলে এরা মানবেই বা কেন?

আমার অনুবাদ পড়ার কোনো দরকার নাই। আমি যথেষ্ট ভাল ইংরেজি পারি। তবু পড়তেছিলাম আমার এই বান্ধবীদের সুবিধার জন্যই। যতই ঘৃণা করি না কেন, একটু পরেই বাংলা দ্বিতীয় পরীক্ষা আর সেটা সবাইকে দিতে হবে, পাস করতেও তো হবে। এরা যেহেতু চায় না তো পড়ে আর কী হবে! বই বন্ধ করে যার বই তার হাতে দিয়ে দিলাম। বইয়ের মালিক, মানে রিকি, বইটা স্কুল ব্যাগের মধ্যে রেখে দিল।

তখনই আমি চিৎকার করে উঠলাম—কীরে, ব্যাগ নিলি কেন? আজকে থেকে তো স্কুল ব্যাগ নেওয়া নিষেধ!paromita-heem-andolom-2

আমাদের সরকারি স্কুল। কয়েক বছর পর পর হেডমিস্ট্রেস বদলায়। নতুন হেডমিস্ট্রেস আসছে কিছুদিন হইল। তার চোখ খারাপ, খুব মোটা লেন্সের চশমা পরে। ওই চশমার ভেতর দিয়ে তার দুইখান চোখের দিকে তাকালে মনে হয় চোখের জায়গায় যেন দুইটা ডিম বসানো। তার চেহারাও খুব খারাপ, মুখের চামড়া ঠাকুরমার ঝুলির ডাইনি বুড়ির মত কুঁচকানো।

তবে সবচেয়ে খারাপ তার মুড। সে আমাদের স্কুলের মেয়েদেরকে দুই চোখে দেখতে পারে না। প্রতিদিন নতুন নতুন নিয়মকানুন করে। আজকে এইটা করা যাবে না তো কালকে সেইটা করা যাবে না। আজকে খোপা করা নিষিদ্ধ, কালকে বেণী করা নিষিদ্ধ। ক্লাসের টাইমে বাথরুমে যাওয়া নিষিদ্ধ। ক্লাসের শেষে চুল আঁচড়ানো নিষিদ্ধ। এরপর স্কুলে চিরুনি আনাই নিষিদ্ধ। মেয়েরা সাজগোজ করলে উনার এত জ্বলে কেন কে জানে! জিনাপ জোক করে বলে, উনি নাকি একদিন নিয়ম করবে—‘ক্লাস টাইমে নিঃশ্বাস নেওয়া নিষিদ্ধ’।

যাই হোক, আজকে থেকে উনার নতুন নিয়ম—পরীক্ষার সময় কোনো ধরনের ব্যাগ, পলিথিন, ফাইল নেওয়া যাবে না।

নিয়মকানুন মানানোর জন্য মহিলা কী রকম যন্ত্রণা করে আমি জানি। তাই প্রবেশপত্র, পেনসিল, কলম, স্কেল এইগুলা আমি আমার স্কুলের জামার পকেটে নিছি। আর ওরা তিনজন প্রতিদিনের মত যার যার ঢাউস সাইজের স্কুল ব্যাগ নিয়ে আসছে। হেডমিস্ট্রেস সব ক্লাসে নিজে গিয়ে পই পই করে বলে আসছে: “পরীক্ষার সময় স্কুলে কোনো ধরনের ব্যাগ আনা যাবে না।”

এরপরেও স্কুল ব্যাগ আনার দরকার কী?

বললাম। কেউ আমার কথা পাত্তাই দিল না। উল্টা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করল। মেরিল পেট্রোলিয়াম জেলি, পাউডার, কাজল, টিস্যু, পানির বোতল, ছোট স্কেল, বড় স্কেল, লাল-নীল-সবুজ কলম—এইগুলা না নিলে ওরা স্কুলে সারভাইভ করবে কেমনে?

কলি বলল, নানা রঙের কালি দিয়ে রচনার প্যারার নামের নিচে দাগ দিতে হবে। তাহলে নাম্বার বেশি দিবে। আর ‘১ নং প্রশ্নের উত্তর’, ‘২ নং  প্রশ্নের উত্তর’ এইগুলা লিখতে হবে নীল কালি দিয়ে, তাহলে খাতাটা দেখতে সুন্দর হবে।

কলির কথা পাত্তা দেই না। সে আন্সারই করে ৬০ নাম্বার। ৪০ নাম্বার ছেড়ে আসবে। ওর এইসব ডিজাইন করার সময় আছে, আমার নাই।

রিকি বলল, কলম যদি স্কুলের জামার পকেটে নিই তাহলে পাছা দিয়ে কালি বের হয়ে আমার জামার বারোটা বেজে যাবে। কে পরিষ্কার করবে ওই জামা? ওই ডাইনি হেডমিস্ট্রেস?

সঙ্গে সঙ্গে জিনাপ বলল, পেন্সিল পকেটে নিলেও তো রানের মধ্যে গুঁতা খেয়ে ইনজুরড হয়ে যাব, তখন কে লাগাবে মলম ওখানে, ‘মাই হেড-মিস-স্ট্রেস’?

বলেই তিনজন আমার দিকে তাকায়ে এমনভাবে হো হো করে হাসতে থাকল যেন আমি হেডমিস্ট্রেস এর চামচা! আমার কী যায় আসে! ওরা স্কুল ব্যাগ নিয়ে যাবে নাকি স্যুটকেস নিয়ে যাবে সেটা ওদের ব্যাপার—আমার তাতে কী?

স্কুলে পৌঁছে গেলাম। প্রতিদিনের মত সেদিনও আমাদের স্কুলের লম্বা লম্বা বারান্দার গ্রিলের সাথে ব্যাগ, পলিথিন এইসব ঝুলানো। নতুন নিয়ম কেউ পাত্তা দেয় নাই। আমার বান্ধবীরাও ওই সারি সারি ব্যাগের মধ্যে তাদের স্কুল ব্যাগ রেখে পরীক্ষা দিতে চলে গেল। আমিও গেলাম।

পরীক্ষার এক ফাঁকে জানালা দিয়ে বারান্দায় অপরিচিত নড়াচড়া চোখে পড়ল। ভাল করে তাকায়ে দেখলাম ওইখানে ঝুলানো সব স্কুল ব্যাগ, পলিথিন আমাদের স্কুলের আয়ারা নিয়ে যাচ্ছে। আমি ফিস ফিস করে সামনের সারিতে বসা জিনাপকে ডাকলাম। ইশারায় দেখালাম বারান্দার কাণ্ডটা। জিনাপ জিহ্বা বের করে মুখ ভেঙচাল। তারপর ফিস ফিস করে বলল, আমার ব্যাগ নিয়ে কবরে যাবে হারামজাদি।

রিকি কলির পরীক্ষার সিট পাশের রুমে। ওরা পরীক্ষা শেষে এসে দেখে পুরা বারান্দা সাফ। কোনো ব্যাগ-বুগ সেইখানে নাই। অন্য মেয়েরাও সবাই হতবাক। ব্যাগ গেল কই? ব্যাগে বাসায় ফেরার ভাড়া আছে। আরো কত কী আছে! এখন এরা বাসায় যাবে কেমনে?

খুঁজতে খুঁজতে ব্যাগ পাওয়া গেল। নিচতলার বাথরুমের সামনে একটা পরিত্যক্ত রুমে আটকানো। বাইরে মান্ধাতার আমলের বিশাল এক তালা। রুমের ভেতরে নানা রকমের স্কুল ব্যাগ আর হাবিজাবি শপিং পলিথিন যেনতেন অবস্থায় রাখা। ওই রুমের একমাত্র জানালা দিয়ে সবাই উঁকিঝুঁকি দিয়ে নিজের ব্যাগ খুঁজতেছে। রুমের বাইরে বিভিন্ন ক্লাসের মেয়েদের বিশাল জটলা। স্কুলের কোনো আয়া কিংবা কর্মচারিদের কাউকে ধারে কাছেও ঘেঁষতে দেখা গেল না।

প্রথমে সবাই কানাকানি শুরু করল, এই নতুন প্রিন্সিপাল কত খারাপ!

—ডাইনি একটা। শাকচুন্নি। পেত্নি।

— প্রিন্সিপাল না এইটা প্রিন্সি-বাল।

কিছুক্ষণ পরই এই ফোঁসফোঁসানি গর্জনে রূপ নিল। সবাই হই হই হই হই করতে থাকল। আমার বান্ধবী রিকি, কলি, জিনাপ পড়ল মহাবিপদে। সঙ্গে আমিও সেমি-বিপদে। আমরা চারজন এক রিকশায় বাসায় ফিরি। ওরা যেতে না পারলে আমি কী করে যাই? তাই আমি স্কুল ব্যাগ ফেরতের দাবিতে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিলাম।

প্রথমে হুংকার ছেড়ে বললাম, আমরা এতগুলা স্টুডেন্ট সবাই মিলে দরজায় ধাক্কা দিব। দরজার তালা ভেঙে আমরা আমাদের ব্যাগ মুক্ত করে আনব।

মেয়েদের চুলের ক্লিপ, সালোয়ারের সেফটিপিন দিয়ে তালা খোলার চেষ্টা করা হইল। তালার মন গলল না। তারপর ক্লাসরুম থেকে লম্বা বেঞ্চ এনে সবাই মিলে দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা দিল। তাতে প্রাচীন, পুরাতন, মহীয়সী স্কুলের প্রাচীন, পুরাতন, গম্ভীর তালা—ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে দাঁড়ায়া থাকল। একটুও টলল না।

এক ঘণ্টা কেটে গেছে। গরমে সবাই হাঁপাচ্ছে।

আমি ঘোষণা দিলাম, আর নয় দরজা, এইবার কাচের জানালা ভেঙে ফেলব। জানালার গ্রিলের ফাঁকে বাঁশ ঢুকায়ে সব স্কুল ব্যাগ উদ্ধার করা হবে। যেই কথা সেই কাজ। বলা মাত্র কোথা থেকে বড় বড় ইট এনে ছুঁড়ে মারল জানালার কাচে। এই নিউ জেনারেশন এঁটেল মাটির ভিজা ভিজা ইটে ওই বহু শতাব্দী পুরানা কাচের টিকিটাও নড়ল না।

সবার কাঁদো কাঁদো অবস্থা। তিন ঘণ্টার পরীক্ষা শেষে এক ঘণ্টা শারীরিক কসরৎ, তার ওপর ব্যাগের টেনশন। সবাই ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত, বিপর্যস্ত। আমি সমবেত জনতাকে আবার পুনরিজ্জীবিত করলাম। আমরা এইবার মিছিল করব। মিছিল করতে করতে আমরা হেডমিস্ট্রেস এর রুমে ঢুকে আমাদের দাবি জানাব।

শুরু হইল মিছিল। আমি সবার সামনে।

স্লোগান ধরলাম, ‘আমাদের ব্যাগ, আমাদের ব্যাগ!’

পেছন থেকে সবাই বজ্রকণ্ঠে—‘দিতে হবে, দিতে হবে!’

আমার বামে রিকি, ডানে কলি, আর পেছনে কমপক্ষে একশ মেয়ে। সে কী টান টান উত্তেজনা! এ যেন ১৯৫২ সালের ভাষার দাবিতে ছাত্র আন্দোলন! আনন্দে আমার লাফাইতে মন চাইল। শরীরে রক্ত যেন টগবগ করে ফুটতেছে! আন্দোলন করতে এত মজা!

যেতে যেতে টিচার্স লাউঞ্জের সামনে আসামাত্র উত্তেজিত জনতার উত্তেজনা কেমন যেন কমে গেল। বাঘের গর্জন হঠাৎ হয়ে গেল মিউ মিউ রূপ। আমি জনতার স্পিরিট ধরে রাখার জন্য আরো জোরে জোরে স্লোগান দিতে দিতে হেডমিস্ট্রেস এর রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়া গেলাম।

কারণ আমি ঢোকার আগেই চেঁচামেচি শুনে উনি রুম থেকে বের হয়ে আসতেছিলেন। আর তখনই চোখের বাম ও ডান কোণা দিয়ে ইঁদুর ছুটে যাওয়ার মত কী কী যেন দৌড়াতে দেখলাম। কানে শুনলাম অনেকগুলা পায়ের দৌড়ে পালানো জুতার খস খস শব্দ। নিজের কানকে বিশ্বাস না করে একবার ডানে, একবার বামে তাকালাম। কোথাও কেউ নাই। সাহস করে পেছনে তাকালাম। পুরা প্যাসেজ খা খা করতেছে। কোনো জনমানব নাই সেখানে। ধুলার মধ্যে অনেকগুলা কেডসের ছাপ এলোমেলো পড়ে আছে।

দুরু দুরু বুকে সামনে ফিরলাম। আমার চোখের সামনে হেডমিস্ট্রেস এর কুঁচকানো চামড়া, যুগলবন্দি ভ্রু। মোটা লেন্সের অস্বচ্ছ কাচের পেছনে দুইটা ঘোলা ঘোলা ডিম অথবা চোখ।

এইবার নিজের চোখকে বিশ্বাস না করে কোনো উপায় নাই। আমিও রুদ্ধশ্বাসে দৌড়াবো কিনা ভাবতেছি, এমন সময় উনি বাজখাই গলায় বললেন, কী ব্যাপার? তুমি এখানে কেন? এইখানে এত চেঁচামেচি কীসের?

যেন আমি বাঘের খাঁচার সামনে দাঁড়ানো ছিলাম। হঠাৎ শিক গলে বাঘ বের হয়ে আমাকে বলল, কী খবর তোমাদের?

আমি মিন মিন করে বললাম, আমার ব্যাগটা ওই রুমে আটকানো, বড়আপা। বাসায় যাবার রিকশা ভাড়া তো ওইখানে। বাসায় যাব কীভাবে?

উনি চিৎকার করে ডাকলেন, প্রদীপ, প্রদীপ।

প্রদীপদা আসল। আর আমাকে দেখে মুচকি মুচকি হাসল। ততক্ষণে অন্য টিচাররাও টিচার্স রুম থেকে বের হয়ে আসল। আর আমাকে দেখে হাসতে হাসতে একজন আরেকজনের গায়ে ঢলে পড়ল। আরো কত কী রঙ-ঢঙ করল! আমি চোখের কোণা দিয়ে সব দেখলাম।

আমাকে টিপ্পনি কাটল কেউ কেউ, কীরে নেতা, তোর পিছের লোক কই? বিপ্লবীরা সব কই গেল?

লজ্জায়, অপমানে আমার চেহারা একবার লাল, একবার বেগুনি, একবার নীল তখন।

হেডমিস্ট্রেস বললেন, প্রদীপ ওর ব্যাগটা কোথায় আছে, ওকে দিয়ে দাও।

প্রদীপদা মান্ধাতা আমলের চাবির গোছা নিয়ে আগায়ে আসল। আমি তার পিছে পিছে হাঁটতে শুরু করলাম। আমার পিছে পিছে হাঁটতে হাঁটতে শুরু করল স্কুলের অ্যাসিস্টেন্ট হেডমিস্ট্রেস মানে ছোটআপা।

আমাকে ওই রুমের সামনে নিয়ে যাওয়া হইল। আমি শেষবারের মত মনে মনে বললাম, তোমার দোহাই লাগে হে ধরণী, দ্বিধা হও।

কেউ দ্বিধা হইল না। তবে ধাঁধায় পড়ল প্রদীপদা নিজেই। এক গোছা চাবির ভেতরে কোনটা যে এই রুমের তালার চাবি সেইটা খুঁজতে খুঁজতে ঘাম ছুটে গেল উনার। পরে সিদ্ধান্ত নিলেন যে সবগুলা চাবি দিয়েই ট্রাই করে দেখবেন কোনটা দিয়ে তালাটা খোলে।

আমার বুকে তখন ধড়াস ধড়াস শব্দ হচ্ছে। মনে মনে চাচ্ছিলাম ছোটআপা এই দীর্ঘ তালা খোলা প্রক্রিয়ায় না থেকে উনার রুমে চলে যাক। না, তাও হইল না। একটা করে চাবি ওই প্রাচীন তালার ভেতরে ঢোকানো হয়, আর আমার বুকের ভেতরে একটা করে মোচড় পড়ে। আমি যত ধর্মের যত ধরনের দোয়া জানি সব মনে মনে পড়তে শুরু করলাম। আর ভগবানের ঠ্যাং ধরে ঝুলে থাকলাম। আমার চারপাশে ছায়াদের গুঞ্জন। দূরে কোন চিপাচুপা থেকে  উঁকি দিয়ে আমার বান্ধবীরা আমার অবস্থা বোঝার চেষ্টা করতেছে।

হঠাৎ ক্যাঁক শব্দ করে তালাটা খুলে গেল। তালা খুলে রুমের ভেতরে আমাকে নিয়ে গেল প্রদীপদা।

বলল, খুঁজে নাও, কোনটা তোমার ব্যাগ? তারপর তাড়াতাড়ি বাসায় যাও। অনেক লেইট হইছে।

আমার পেছনে তখন অ্যাসিস্টেন্ট হেডমিস্ট্রেস ওরফে ছোট আপা দাঁড়ানো। যেন মাথার পিছনে বন্দুক ধরে আছে সরকার নিয়ন্ত্রিত বাহিনি। আর সামনে অসংখ্য প্রতারক, পলায়নপর বিপ্লবীর সারি সারি স্কুল ব্যাগ।559315_423984217643469_465037760_n

উপহার ৩।

উপহার ১ এবং ২ লেখার পর মহাবিপদে পড়েছি। আমার আত্মিয় বন্ধু দাওয়াত দিয়ে বলে “তুই আসিস, গিফট আনতে হবে না”। এছাড়াও নানা রকম যন্ত্রণা আছে। আমার লেখা উপহারের বিরুদ্ধে না, বুঝতে পারছি যা বোঝাতে চেয়েছি তা পারিনি। পন্ডিত ব্যক্তিরা অল্প কথায় আসল ব্যাপার বোঝাতে পারে, যেমন আমার মূল বক্তব্য এক লাইনে পরিস্কার বলে দিয়েছেন মাদার তেরেসা।

“It’s not how much we give but how much love we put into giving.”

― Mother Teresa

আগের দিনে উপহারে দেয়া হত ফুল আর বই। ফুল কিনতে হয় এটা আমরা অনেক বড় হয়ে শিখেছি।  বাগান-লন-পথ-ঘাট-বন-বাদাড় এবং অন্য মানুষের বাসায় ফুল ফুটে থাকবে কারণে অকারণে ছিঁড়বো এটাই ছিল স্বাভাবিক। একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা দিবসে শহীদ মিনারে যেতাম সবাই। তখন নিরাপত্তার এত অভাব ছিলনা। নোংরা রাজনীতি এসব মহান জাতীয় অনুষ্ঠান থেকে দূরে থাকতো। এখন গিজ গিজ করে র‍্যাব, পুলিশ, গোয়েন্দা, তাদের হাতে অত্যাধুনিক্ সরঞ্জাম, অস্র, কমিউনিকেশন ডিভাইস, সারভিলেন্স এর যন্ত্রপাতি। কিন্তু নিরাপত্তার মানসিক স্বস্তি সেখানে নেই।

আমাদের বয়স যখন ৮/১০ তখন থেকেই কাছের শহীদ মিনারগুলোতে একা একাই যেতাম। রাতে অবশ্য আমরা ফুল চুরি করতাম, মুলত মহল্লার বিভিন্ন বাসা থেকে কিংবা সরকারি অফিস কমপ্লেক্স থেকে। এই চুরিতে কেউ কিছু মনে করতো না। শুধু যাদের গাছ, ডাল-পালা এবং অনেক সাধের ফুল সাবাড় করা হত তারা একটু কষ্ট পেত, আর সারারাত টেনশনে থাকতো তার বাগানে কি পরিমান ধ্বংস যজ্ঞ চলবে তা নিয়ে। পাশের বাসায় এক হিন্দু ভদ্রলোকের অনেক ফুল ছিল, উনি সারারাত টর্চ জ্বেলে বসে থাকতেন।

আরেকটি উপহার ছিল বই, সব সময় সস্তা। আগের দিনে লেখক মানেই গরীব, না খেতে পাওয়া, চোয়াল ভাংগা উদাস মানুষ। এখনকার ড্যান ব্রাউন সাহেবের মত ধনী লেখক ছিল না। শুনেছি উনার বছরে আয় ৬৫০ কোটি টাকা। তারপরেও উনার একটা বই বাচ্চাদের একটা খেলনার চেয়ে সস্তা।

উপহার হতে হবে স্বতঃস্ফুর্ত। ভালবাসা প্রণোদিত। বাধ্যতামূলক, সামাজিক, লোক দেখানো নয়। একবার আমার এক প্রিয় মানুষের বাসার কাছ দিয়ে যাচ্ছি, ভাবলাম অনেকদিন পর যাচ্ছি আবার কবে আসবো কে জানে একটু দেখা করে যাই। তিনি বেশ আপ্যায়ন করলেন এবং সাথে দুই কথা শুনিয়ে দিলেন হাতে করে কিছু নেইনি কেন। কোনো বাসায় গেলেই যদি কিছু নিয়ে যেতে হয় তাহলে হিসেব করে যেতে হয়। আমার সামর্থ্য আছে, মনও আছে। ঘনিষ্ট মানুষেরা জানে আমার সমস্যা দোকানে যাওয়া এবং কেনা নিয়ে। আমি দরদাম করতে হয় বলে ফিক্সড প্রাইস দোকান ছাড়া যাইনা। ঢাকায় এসব দোকান এখন অনেক হলেও আগের দিনে খুব কম ছিল। যখন দরদাম করে বিপুল পরিমান ঠকে আসতাম তখন মানসিক শান্তি বিঘ্নিত হত। এজন্য নয় যে আমার বেশি টাকা চলে গেল, একজন মানুষ প্রতারণা করছে এই অনভূতিই কষ্টের। একই কারণে আমি সরকারি অফিসেও যাইনা, বাবার বয়েসি লোকজন অবলীলায় ঘুষ চায়, এটা দেখলে মানুষ জাতির উপর বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়।

এখন অনলাইনে অনেক জিনিষ কিনি বলে আমার বাবা আমার উপর মহা খেপে আছেন, এটা আবার কি রকম শপিং? না দেখে, না বুঝে, দামও নিশ্চিত বেশি নেয়! দাম সম্পর্কে আমার নিজের একটা কৌশল খুব কাজে লাগে। এই আবিস্কারের পর থেকে কেনা কাটা নিয়ে আমার সুখ নিরংকুশ। কৌশলটি হলো পন্যের দাম কত এটা আমলে নিই না। এই পন্যটির জন্য আমি কত দাম দিতে চাই সেটা বিবেচনা করে আমি মূল্য নির্ধারণ করি, এবং ফলাফল খুবই আশাদায়ক। আমার মত ছাগল যারা আছেন এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে পারেন, ভাল ফল পাবেন। কেউ যখন কোন শপিং করে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করে এটার দাম কত বল দেখি? আমার উত্তর শুনে অনেকে অবাক হয়ে যায়, এত অনভিজ্ঞ একজন কিভাবে এত কাছাকাছি দাম বলে? তবে কাপড়ের দামের ক্ষেত্রে এখন একটু কঠিন হয়ে গেছে। এখন জিজ্ঞেস করতে হয় কোথা থেকে কিনেছেন?

সবাই দামী উপহার পছন্দ করে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু উপহার এর সংস্কৃতি হওয়া উচিত নির্মল। সেটা হতে গেলে সামগ্রিকে দেখতে হবে শুধু মাধ্যম হিসাবে। সামগ্রি কখনো আত্মার পরিমাপ হতে পারেনা। জানি এই পুজিবাদি, ভোগবাদী সমাজে এসব কথার কোন মানে নেই, তারপরও আমি আমার অবস্থান পরিস্কার করলাম।

উপহার যারা দেন আমি তাদের কথাই বলছি, যারা নেন তাদের কথা কম বলছি কারণ এটা গ্রহীতার মানসিকতার বিষয়, ভালবাসা পেয়েও যদি তার মূল্যায়ন করতে না পারেন তবে তার জন্য সমবেদনা। এ বিষয়ে অসাধারণ একটা উক্তি আছে।

“I know what I have given you…

I do not know what you have received.”

― Antonio Porchia